ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পরাজয়ের কারণ

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধটি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাওয়ার যোগ্য। এর কারণ এই নয় যে, এটি ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছে, বরং কারণ এটি যে, ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে বদলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

বুধবার রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গিগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের গুরুত্ব এখনো আছে। কিন্তু শক্তি প্রয়োগের পরিণতি আগের চেয়ে কম অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। কারণ, বলপ্রয়োগ এখন আর সরলরৈখিক ফলাফল দেয় না। এটি ঘটেছে ইরানের ক্ষেত্রে। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াও বিষয়টি নিষেধাজ্ঞাসহ ও অন্য চাপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

যুদ্ধের ব্যর্থতার কারণ

রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান সম্পাদক ফাইদর লুকিয়ানভের লেখা ওই প্রতিবেদনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হারের কারণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, যদি বাগাড়ম্বর সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে চিত্রটি বেশ সরল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর শক্তিশালী জোট স্পষ্টতই দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ দুর্বল প্রতিপক্ষটিই ইরান। দেশটির পাশে ছিল মিত্র সশস্ত্র সংগঠনগুলো এবং রাশিয়া ও চীনের সীমিত সমর্থন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল এমন এক শাসনব্যবস্থাকে দ্রুত ও চূড়ান্ত আঘাত হানা, যাকে বাহ্যিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে আপাত দুর্বল বলে মনে হতো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ'র দাবি যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার মনোভাবকে পুরোপুরিভাবে স্পষ্ট করেছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, তেহরান চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু ঘটল ঠিক উলটো। আক্রমণকারী পক্ষের উন্নততর শক্তি অপ্রত্যাশিতভাবে সর্বোচ্চ প্রতিরোধের সম্মুখীন হলো। প্রাথমিক আঘাত হানার পর ইরান ভেঙে পড়েনি; বরং পুনর্গঠিত ও সংগঠিত হলো। পাশাপাশি অনেক প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া জানাল। আর এতেই নতুন যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে অপ্রতিসম পালটা-আক্রমণ দৃশ্যমান হয়।

ইরানের কৌশল

ইরান প্রচলিত শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমকক্ষ ছিল না। এর প্রয়োজনও ছিল না তার। তবে তার হাতে যা কিছু ছিল, তা তারা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করেছে। তারা শত্রুপক্ষের সুবিধাকেই অকার্যকর করে দিয়েছে।

  • প্রথমত, ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়, যা করার হুমকি দীর্ঘদিন ধরে তারা দিলেও আগে কখনো সাহস দেখায়নি।
  • দ্বিতীয়ত, এটি শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগীদের সম্পদেও আঘাত হেনেছিল।
  • তৃতীয়ত, ইরানের অস্ত্রভান্ডার অপেক্ষাকৃত কম হলেও তা আঘাত সহ্য করতে সক্ষম নয়-এমন দেশের ক্ষতিসাধনের জন্য যথেষ্ট ছিল।
  • চতুর্থত, ইরান তার শত্রুদের তুলনায় যথেষ্ট বেশি ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা দেখিয়েছে।

বর্তমান ফলাফলই সব বলে দিচ্ছে। কারণ, যে বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধে জড়িয়েছিল, তার কোনোটিই তারা পায়নি। সবকিছু আবারও ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সবাই বোঝে যে পারস্য কূটনীতির ঐতিহ্য অনুযায়ী আলোচনার অর্থ হলো দৃঢ়তা ও ধৈর্য।

ভবিষ্যৎ পরিণতি

মোদ্দাকথা, পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া একটি তীব্র সশস্ত্র সংঘাতের পর এখন স্থিতাবস্থা ফিরতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, যদিও এর শর্তগুলোও এখনো অস্পষ্ট। কারণ, উভয়পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ছে। অন্যদিকে শক্তিশালী পক্ষের গুরুতর ঝুঁকি, বিশেষ করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ঝুঁকি মেনে নেওয়ার ইচ্ছা কমে আসছে। এটি অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে এটি বিশেষভাবে দৃশ্যমান।

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী শক্তির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প এখন আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে জড়াতে গভীরভাবে অনিচ্ছুক। কারণ, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছেন।