ভারতীয় আলোকচিত্রীর চোখে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তিনি বিভিন্ন এলাকায় শরণার্থীদের দুর্দশা, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে আলোকচিত্র তুলেছিলেন।
শরণার্থীদের দুর্দশা
তিনি এক এলাকায় যান যেখানে উদ্বাস্তুরা স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল। খালি জায়গায় তাঁবু গাড়ার চেষ্টা করছিল। কেউ কেউ বড় সিমেন্টের পাইপের মধ্যেও আশ্রয় নিয়েছিল। বর্ষার কারণে রান্না চলত সেখানেই। শিশুরা ক্ষুধার্ত ছিল, কিন্তু খাবার কোথায়? একটি শিশুর ছবি তুলেছিলেন যার চোখে পানি টলটল করছিল কিন্তু গড়িয়ে পড়ছিল না। এক বৃদ্ধা ক্লান্ত ও অবসন্ন ছিলেন; তাঁর সামনে বসলে তিনি মাথা তুলে যন্ত্রণাবিদ্ধ চোখে তাকান এবং অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
বাঙালির সংবেদনশীলতা
রঘু রাই বলেন, বাঙালিরা আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। কলকাতার রাস্তায়ও গ্রাম থেকে আসা কোনো চেনা পরিবার দরজার সামনে বোঁচকা রাখলে কেউ বলবে না ‘এখানে বসবেন না’ বরং বলবে ‘একটু জায়গা করে নিন’। নৃশংসতা ছিল অবিশ্বাস্য, তাই সর্বত্র সাহায্য করছিল।
পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা
সামরিক বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা দিতে নারীদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা করত। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্রমাগত সেটাই করছিল। এমনকি বুদ্ধিজীবীদেরও হত্যা করা হয়েছিল; যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, তাঁদের কাউকে রেহাই দেওয়া হয়নি। নির্যাতন ছিল অন্তহীন ও নির্মম।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যাত্রা
তিনি দিল্লি থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এসেছিলেন। সেনাশিবিরটি খুলনা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল। তিনি প্রথম কলামের সঙ্গে যাত্রা করেন—একটি ট্যাংক ও প্রায় একশ সৈন্য। ট্যাংকটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করেছিল। হঠাৎ এয়ার বার্স্ট শুরু হয়—মাথার ৪০-৫০ ফুট ওপরে ছোট ছোট শেল ফেটে মানুষ মেরে ফেলে। প্রথম শেল ১০০ মিটার দূরে, দ্বিতীয়টি ৫০ মিটার দূরে, তৃতীয়টি মাত্র ২০ মিটার দূরে পড়ে। কেউ তাদের পথ দেখাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন বলেন, ‘পরের আক্রমণটা আমাদের দিকে লক্ষ্য করে হতে পারে।’ তারা ট্যাংক ও জওয়ানদের ছেড়ে অন্যদিকে দৌড়াতে শুরু করে; সময়টা ছিল আতঙ্কের।
ঢাকার পথে এবং যুদ্ধের চিত্র
সেনাবাহিনী ঢাকার দিকে এগিয়ে চলেছে, যুদ্ধ তখনো চলছে। কোথাও কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছিল না। সবাই লুকিয়ে ছিল। যশোর খুব খারাপভাবে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; বহু ঘর ভাঙা ও পোড়া অবস্থায় ছিল, মৃতদেহ পড়ে ছিল। তারা ছবি তুলেছিলেন।
আত্মসমর্পণের কূটনীতি
জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব একটি চালাক খেলা খেলেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে বলেন, ‘আমরা চারদিক থেকে আপনাদের ঘিরে ফেলেছি। বড় বিপর্যয়ের আগে বসে কথা বলি?’ জ্যাকব তাঁকে বলেন, ‘আপনারা আত্মসমর্পণ করুন, অযথা রক্তপাতের দরকার নেই।’ নিয়াজি জানান, তাঁদের ৯০ হাজার সৈন্য আছে। জ্যাকব বলেন, ‘আমরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছি, বিমানবাহিনী প্রস্তুত। আত্মসমর্পণ করলে আপনার সৈন্যদের কিছু হবে না।’ তিনি নিয়াজি ও তাঁর পরিবারকে শতভাগ নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেন। জ্যাকব ২৪ ঘণ্টা সময় দেন; পরে তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহর ঘিরে আমাদের সৈন্য ছিল মাত্র ১৮ হাজার। ওঁরা লড়াই করলে পেরে ওঠা কঠিন হতো।’
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান
পরদিন ফোন করলে নিয়াজি বলেন, ‘কে আপনাকে বলল যে আমরা আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছি?’ জ্যাকব বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনার পছন্দ। কিন্তু এটাই আমাদের শেষ বার্তা।’ নিয়াজি বলেন, ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, এক মিনিট অপেক্ষা করুন।’ তারপর জানতে চান আত্মসমর্পণ কীভাবে হবে। তাকে বলা হয়, ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকার একটি উদ্যানে যথাযথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। নিয়াজি ব্যক্তিগত আত্মসমর্পণ চান; আলোচনা চলতে থাকে। অবশেষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। জেনারেল অরোরা ও জেনারেল জ্যাকব হেলিকপ্টার থেকে নামেন, নিয়াজি মাথা নিচু করে হাঁটছিলেন, ভারতীয় সেনানায়কেরা আত্মমর্যাদার সঙ্গে হাঁটছিলেন। আত্মসমর্পণপত্রে স্বাক্ষর হয়, সবাই ছবি তোলেন। ঘটনাটা যেন অন্য পৃথিবীতে ঘটছিল। আত্মসমর্পণের পর ঢাকার রাস্তায় কী উল্লাস, কী আনন্দ! একেবারে অন্য রকম পরিবেশ।
আলোকচিত্রীর পুরস্কার
রোম, লন্ডন, প্যারিস, ওয়াশিংটন, হংকং—বিশ্বের রাজধানী শহরগুলোয় তিনি তাঁর তোলা ছবির প্রদর্শনী নিয়ে যান। মানুষ জানতে পারে সেখানে কী ঘটেছে; কী দুর্দশা, কষ্ট ও নির্যাতন চলেছে। লে মঁদ, লা ফিগারো, নিউইয়র্ক টাইমস—নানা জায়গায় তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। ভারতে ফেরার পর প্রথমবারের মতো একজন আলোকচিত্রশিল্পীকে পদ্ম পুরস্কার দেওয়া হয়। কারণ, একজন আলোকচিত্রশিল্পী বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন; ইতিহাসের ভিজ্যুয়াল রেকর্ড এক অনস্বীকার্য প্রমাণ।



