পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য গুহা, যা মাটির নিচে অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী। যেমন কেন্টাকির একটি গুহা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ গুহাব্যবস্থা, ভিয়েতনামের একটি গুহা সবচেয়ে বড়, আর মেক্সিকোর একটি গুহা দীর্ঘতম পানির নিচের গুহা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গুহা কোনটি? এবং সেই গুহায় কী অদ্ভুত প্রাণীরা বাস করে?
গভীরতম গুহার প্রতিযোগিতা
এই প্রতিযোগিতায় একক কোনো বিজয়ী নেই। বরং দুটি গুহা পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর গভীরতম গুহার রেকর্ড নিজেদের দখলে রাখছে। গুহা দুটি হলো ভেরিওভকিনা ও ক্রুবেরা-ভোরোনিয়া। এরা উভয়েই জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রের আবখাজিয়া অঞ্চলের গাগ্রা পর্বতমালায় অবস্থিত। চুনাপাথরে তৈরি এই গুহাগুলোর গভীরতা মাটি থেকে ৬ হাজার ৫৬০ ফুটেরও বেশি। অভিযাত্রী ও বিজ্ঞানীরা যখন এদের ভেতরে নতুন কোনো পথের সন্ধান পান, তখনই গভীরতার পরিমাপ ও রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়।
বর্তমান রেকর্ড
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের পানিবিজ্ঞানী ও ভূতত্ত্ববিদ পল বার্গারের তৈরি বিশ্বের গভীরতম গুহার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভেরিওভকিনা গুহা। এর গভীরতা প্রায় ৭ হাজার ২৫৭ ফুট বা ১ দশমিক ৩৭ মাইল। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ক্রুবেরা গুহার গভীরতা ৭ হাজার ২১৫ ফুট। তবে গভীরতার পার্থক্য এত কম যে যেকোনো সময় রেকর্ড ওলটপালট হতে পারে। গবেষকরা জানান, এত গভীরে খাড়া বা উল্লম্ব পরিমাপ করার সময় কয়েক ফুট পর্যন্ত ভুল হতে পারে। তাই নতুন তথ্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান প্রায়ই অদলবদল হয়।
গুহা তৈরির ইতিহাস
এই দুটি গুহাই ককেশাস পর্বতমালার আরাবিকা ম্যাসিফ নামের একটি বিশেষ কার্স্ট অঞ্চলে অবস্থিত। কার্স্ট হলো এমন ভূপ্রকৃতি যা মার্বেল, জিপসাম বা সহজে গলে যাওয়া চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, প্রায় ১৬ কোটি ৩৫ লাখ থেকে ১০ কোটি ৫ লাখ বছর আগে জুরাসিক ও ক্রেটাসিয়াস যুগে সাগরের নিচে স্তরে স্তরে এই চুনাপাথর জমা হয়েছিল। পরবর্তীতে টেকটোনিক প্লেটের চাপে পাথরের স্তরগুলো সংকুচিত হয়ে ওপরের দিকে উঠে খাড়া পাহাড়ি দেয়ালে পরিণত হয়। বৃষ্টি ও বরফ গলা পানি যুগের পর যুগ ধরে শিলা ক্ষয় করে মাটির নিচে এমন গুহা তৈরি করেছে।
গভীর গুহা তৈরির কারণ
বিজ্ঞানীদের মতে, এ অঞ্চলে এত গভীর গুহা তৈরি হওয়ার মূল কারণ পর্বত গঠন। চুনাপাথরের স্তরগুলো মাটির সঙ্গে প্রায় খাড়াভাবে হেলে থাকায় পানি বাধা না পেয়ে সোজা নিচে নেমে যাওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়া ওপরে একটি বিশাল মালভূমি থাকায় সেখানে প্রচুর পানি জমা হয়, যা প্রতিনিয়ত নিচের দিকে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে পাথর ক্ষয় করতে সাহায্য করে।
গুহার পরিবেশ ও প্রাণী
মাটির নিচে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এই গুহাগুলো কিন্তু সোজা পথের নয়। এগুলো অত্যন্ত অন্ধকার, ভেজা ও বরফশীতল। গাগ্রা পর্বতশ্রেণির এই গুহাগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা সারা বছর গড়ে ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকে। এমন বৈরী পরিবেশেও কিছু প্রাণী বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছে। ২০১০ সালে ক্রুবেরা গুহায় অভিযানের সময় বিজ্ঞানী রেবোলেইরা ও তাঁর সহকর্মীরা মাটির প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ফুট গভীরে এক ধরনের ডানাবিহীন পোকার সন্ধান পান, যার নাম ‘স্প্রিংটেইল’। বৈজ্ঞানিক নাম Plutomurus ortobalaganensis। পোকাটি গুহার ভেতরের ছত্রাক ও পচনশীল জৈব পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। আবিষ্কারের পর থেকে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরে বাস করা স্থলচর প্রাণী হিসেবে রেকর্ড ধরে রেখেছে।



