লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন: ঢাকার আধুনিকতার প্রতিবন্ধকতা
লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন: ঢাকার আধুনিকতার বাধা

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীতে লক্কড়-ঝক্কড় ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার সিদ্ধান্ত সময় উপযোগী সিদ্ধান্তই বলতে হবে। বাংলাদেশ এখন মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করেছে। উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, আধুনিক অবকাঠামো—সব মিলিয়ে ঢাকাকে একটি আধুনিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এই আধুনিকতার বড় প্রতিবন্ধকতা হলো লক্কড়-ঝক্কড় মেয়াদোত্তীর্ণ জীর্ণ বাস ও অন্যান্য যানবাহন। প্রতিদিন লাখো মানুষকে চলাচল করতে হয় এমন সব বাসে, যেগুলোকে মানুষ ব্যঙ্গ করে ‘মুড়ির টিন’ বলে।

এক শহরে দুই সময়ের সহাবস্থান

এ যেন একই শহরে দুই ভিন্ন সময়ের সহাবস্থান—একদিকে আধুনিক মেট্রোরেল, অপরদিকে মরিচাধরা, ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক গণপরিবহন। একটি দেশের রাস্তায় চলা বাস, ট্রাক কিংবা গণপরিবহনের চেহারা অনেক সময় সেই দেশের উন্নয়নের নীরব পরিচয় বহন করে। বিমানবন্দরে নামার পর কোনো বিদেশি প্রথমেই যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করে, তার অন্যতম হলো সড়ক ও যানবাহন। সেখানেই বোঝা যায়—দেশটি কেবল অর্থনীতিতে নয়, নাগরিক রুচি, পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদায় কতটা এগিয়েছে।

ঢাকায় আজও এমন অসংখ্য বাস চলে, যেগুলো কেবল পুরোনো নয়, বিপজ্জনকও। অনেক বাসের দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না, জানালার কাচ ভাঙা, বডি মরিচা ধরা, সিট ছেঁড়া, ইঞ্জিনের শব্দ অসহনীয়। কোথাও কোথাও মনে হয়, এটি যাত্রীবাহী যান নয়, যেন চলন্ত লোহার খাঁচা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে এসব যানবাহনে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছোট বাসের যুগের অবসান

কিন্তু সমস্যাটি শুধু জরাজীর্ণ বাস নয়, সমস্যাটি বাসের ধরন ও সংখ্যাতেও। ঢাকার রাস্তায় বিপুল সংখ্যক ছোট ছোট বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। প্রতিটি বাস বড় বাসের তুলনায় অল্প যাত্রী বহন করলেও রাস্তার জায়গা দখল করে সমানভাবে। ফলে একই পরিমাণ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি যানবাহন রাস্তায় নামে। এর ফল অতিরিক্ত যানজট, বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা এবং সময়ের অপচয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ছোট ছোট বাসের যুগ বাস্তবিক অর্থেই শেষ হওয়া উচিত। এখন প্রয়োজন বড় ধারণক্ষমতার আধুনিক বাস। একটি বড় বাস যেখানে ৭০ থেকে ১০০ যাত্রী বহন করতে পারে, সেখানে কয়েকটি ছোট বাস একই কাজ করতে গিয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও জট বাড়ায়। উন্নত নগর পরিকল্পনায় তাই ধীরে ধীরে মিনিবাস কমিয়ে বড় ও মানসম্মত বাসে রূপান্তরের প্রবণতা দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

পৃথিবীর অনেক দেশ বহু আগেই বুঝেছে—গণপরিবহন কেবল মানুষ পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি রাষ্ট্রের সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। মালয়েশিয়ার সাধারণ শহুরে বাসেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, নিরব ইঞ্জিন, পরিচ্ছন্ন আসন, ডিজিটাল ডিসপ্লে ও প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশপথ থাকে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কিংবা সিঙ্গাপুরে বাসে উঠলে মনে হয়—এটি যেন একটি চলমান আধুনিক লাউঞ্জ। এমনকি ভারতের দিল্লি, বেঙ্গালুরু কিংবা কলকাতাতেও দ্রুতগতিতে আধুনিক বড় বাস, ইলেকট্রিক বাস ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।

আর আমরা? রাজধানী ঢাকায় এখনও এমন বাস চলে, যেগুলো রাস্তার মাঝখানে, ফ্লাইওভারের ওপরে বিকল হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি করে। একটি অকার্যকর বাস পুরো শহরের গতি থামিয়ে দেয়। প্রতিদিন লাখো মানুষকে অমানবিক পরিবেশে যাতায়াত করতে বাধ্য করা হচ্ছে। যেন সাধারণ মানুষের সময়, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার কোনো মূল্য নেই।

অভিযানের ইতিবাচক দিক

ঢাকা মহানগর পুলিশের মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। যদিও আগের সরকারের সময়ে এরকম উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হয়েছে, আবার থেমেও গেছে। উদ্যোগ নেওয়ার সময় কিছুদিন গরম থেকেছে তারপর কেন যেন ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গেছে। নতুন সরকারের সময় সে রকমটি হবে না বলে আশা করা যেতে পারে।

বিআরটিএর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর, আর ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ২৫ বছর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিয়ম এতদিন কার্যকর ছিল কোথায়? কেন বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাজধানীতে চলার সুযোগ পেলো?

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার

শুধু অভিযান চালালেই হবে না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত সংস্কার। প্রথমত, ধাপে ধাপে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ মিনিবাস কমিয়ে বড় ধারণক্ষমতার আধুনিক বাস নামাতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই রুটে অসংখ্য কোম্পানির বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতার বদলে সমন্বিত ‘রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে বাসের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে এবং রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতাও কমবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল টিকিটিং, নির্ধারিত স্টপেজ ও কঠোর ফিটনেস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যত্রতত্র দাঁড়ানো ও ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল কমে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গণপরিবহনকে কেবল ব্যবসা হিসেবে দেখা যাবে না, এটি একটি নগরসভ্যতার মৌলিক অবকাঠামো। একজন নাগরিক প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি সময় কাটায় রাস্তায়। তার উন্নয়নের অনুভূতি আসে বাসে ওঠার সময়, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়, সম্মান নিয়ে চলাচল করার সুযোগ থেকে।

একটি রাষ্ট্র যদি তার নাগরিককে প্রতিদিন ‘মুড়ির টিনে’ ঝুলিয়ে কাজে পাঠায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে বড় বড় বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে ফাঁপা শোনায়। কারণ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

ঢাকার সড়কে আজও হাজার হাজার কালো ধোঁয়া ছড়ানো বাস ও ট্রাক চলছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় একটি উৎস হলো পুরোনো ডিজেলচালিত যানবাহন। শিশুরা হাঁপানিতে আক্রান্ত হচ্ছে, বয়স্করা ফুসফুসের রোগে ভুগছেন। অথচ উন্নত বিশ্ব বহু আগেই পরিবেশবান্ধব বাস, ইলেকট্রিক গণপরিবহন ও স্বল্প-নির্গমন প্রযুক্তির দিকে চলে গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আমরা ধীরে ধীরে এই অস্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গেই মানিয়ে নিচ্ছি। মানুষ এখন ভালো বাস দেখলে অবাক হয়, খারাপ বাস দেখলে নয়। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

উপসংহার

বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে শুধু মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই হবে না, সেই শহরের বাস ব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে। আধুনিক ঢাকা মানে শুধু উড়ালসড়ক নয়, আধুনিক ঢাকা মানে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, আরামদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা। এমন বাস, যেখানে একজন শ্রমিকও সম্মান নিয়ে উঠতে পারে, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে যেতে পারে—একজন নারী আতঙ্ক ছাড়া চলাচল করতে পারে।

মেট্রোরেলের শহরে ‘মুড়ির টিন’ বাস কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়, এটি উন্নয়নের ভেতরের অসম্পূর্ণতার প্রতীক। যে শহর নিজেকে আধুনিক বলে পরিচয় দিতে চায়—সেই শহরের রাস্তায় আর চলতে পারে না মরিচাধরা, ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক গণপরিবহন। ঢাকা সত্যিকার অর্থে আধুনিক হবে সেদিনই, যেদিন এর সাধারণ মানুষও সম্মান নিয়ে বাসে চড়তে পারবে।