শিশুদের টিকা: জীবন রক্ষাকারী সুরক্ষা ঢাল
একটি শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই। এই লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো টিকা। শিশু জন্মের পরপরই তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকে, আর টিকা সেটি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই শিশুদের নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া হয়, যা মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে তাদের রক্ষা করে। একসময় যেসব রোগে লাখ লাখ শিশু প্রাণ হারাত, টিকা সেসব রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
টিকাদানের দুই ধরনের ব্যবস্থা
বাংলাদেশে টিকাদান মূলত দুই ধরনের: সরকারি টিকা এবং বেসরকারি টিকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান ও নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব টিকা শিশুর যথাযথ বয়সে যথাযথ ডোজ দিতে হয়। সরকারি টিকা হলো সরকার নির্ধারিত বাধ্যতামূলক ও জরুরি টিকা, যা শিশুকে মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সব শিশুকে এসব টিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
সরকারি টিকার তালিকা ও কার্যকারিতা
- বিসিজি: যক্ষ্মা প্রতিরোধে এই টিকা দেওয়া হয়।
- পেন্টাভ্যালেন্ট: ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি থেকে সুরক্ষা দেয়।
- ওপিভি/আইপিভি: পোলিও রোগ প্রতিরোধে মুখে ড্রপ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
- পিসিভি: নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এবং সেপসিস থেকে রক্ষা করে।
- এমআর: হাম ও রুবেলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর।
- ডিটি/টিডি/টিটি/ডিপিটি: ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
- র্যাবিস: জলাতঙ্ক প্রতিকারে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
এছাড়া, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। সরকারি টিকা নির্ধারিত সময়ে সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিকে নিলে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
বেসরকারি টিকা: অতিরিক্ত সুরক্ষার বিকল্প
বেসরকারি টিকা বাধ্যতামূলক নয়, তবে শিশুদের অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে দেওয়া হয়। সাধারণত বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে কিনে প্রয়োগ করতে হয়। বেসরকারি টিকার মধ্যে রয়েছে:
- রোটাভাইরাস: ডায়রিয়া প্রতিরোধে সহায়ক।
- ভারিসেলা: জলবসন্ত থেকে সুরক্ষা দেয়।
- হেপাটাইটিস এ: জন্ডিস বা লিভার সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
- টিসিভি: টাইফয়েড জ্বরের বিরুদ্ধে কার্যকর।
- ইনফ্লুয়েঞ্জা: সিজনাল ফ্লু থেকে রক্ষা করে, বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাযুক্ত শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- এমএমআর: হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়।
- এইচপিভি: গর্ভাশয়ের ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার প্রতিরোধে মেয়ে শিশু ও নারীদের জন্য উপকারী।
- মেনিনোকক্কাল: মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
- ইটিইসি: কলেরা ও ডায়রিয়া প্রতিরোধে সহায়ক।
বেসরকারি টিকার দাম প্রতি ডোজ আনুমানিক এক হাজার থেকে আট হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে, হাসপাতালভেদে পরিবর্তিত হয়।
টিকা দেওয়ার সময়সূচি: জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদের মতে, টিকা সময়সূচি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু টিকার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে আসে, তাই বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়। ডোজ মিস হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ তৈরি হয় না, ফলে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস: ছয় সপ্তাহের মধ্যে বিসিজি টিকা, পেন্টাভ্যালেন্ট, পোলিও ও পিসিভির প্রথম ডোজ। দশ ও চৌদ্দ সপ্তাহে পরবর্তী ডোজ দেওয়া হয়।
- নয় মাস থেকে দুই বছর: নয় মাসের মধ্যে এমআর টিকা, পনেরো মাসে বুস্টার ডোজ। এক বছর বয়সে হেপাটাইটিস এ বা এমএমআর টিকা দেওয়া যেতে পারে।
- পাঁচ থেকে ষোল বছর: পাঁচ বছর বয়সে ডিটি টিকা, দশ বছর বয়সের পর এইচপিভি টিকা, এবং দশ থেকে ষোল বছর বয়সে টিডি টিকা দেওয়া হয়।
কোনো টিকা সময়ের আগে দেওয়া যাবে না, কিন্তু ডোজের সময় পেরিয়ে গেলে দেরিতে হলেও দেওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেক অভিভাবক টিকা নিয়ে ভয় পোষণ করেন, বিশেষ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। টিকা দেওয়ার পর শিশুর হালকা জ্বর, ব্যথা, বা টিকা দেওয়ার স্থানে ফুলে যাওয়া স্বাভাবিক এবং সাময়িক। এসব লক্ষণ সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে অতিরিক্ত জ্বর বা খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণার মধ্যে রয়েছে:
- একসাথে অনেক টিকা দিলে ক্ষতি হয়: বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর শরীর সময়সূচি মেনে সব টিকা সামলাতে সক্ষম।
- সরকারি টিকাই যথেষ্ট: বেসরকারি টিকা অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে, তাই চাইলে নেওয়া যেতে পারে।
- বাচ্চা বাসায় থাকলে টিকার দরকার নেই: সংক্রমণ পরিবার, অতিথি বা বাতাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
টিকাদান শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সামাজিক দায়িত্ব। হার্ড ইমিউনিটির ধারণা অনুযায়ী, সমাজের বেশিরভাগ মানুষ টিকা নিলে পুরো সমাজ সুরক্ষিত থাকে। তাই একটি শিশুর টিকা দেওয়া মানে শুধু তার নিজের নয়, বরং পুরো প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।



