আপনার শিশুকে হাম প্রতিরোধে টিকা দেওয়াই তাকে সংক্রমিত হওয়া এবং অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ানো থেকে সুরক্ষিত রাখার সর্বোত্তম উপায়। ইউনিসেফ বলছে, হামের টিকা খুবই নিরাপদ ও কার্যকর এবং বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদানের অংশ হিসেবে এটা দেওয়া হয়।
হামের টিকা কীভাবে কাজ করে
শিশুকে শুধু হামের টিকা দেওয়া যেতে পারে অথবা মাম্পস ও রুবেলা টিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যা হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নামে পরিচিত। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য শিশুদের এই টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সারাজীবনের জন্য হয়ে থাকে।
শিশুর বয়স অনুযায়ী টিকার সময়সূচি
শিশুর হামের টিকা নেওয়ার সঠিক বয়স দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।
প্রথম ডোজ: যেসব দেশে হাম বেশি হয়ে থাকে, সেখানে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। কারণ তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। যেসব দেশে হাম তেমন দেখা যায় না, সেসব দেশে শিশুদের সাধারণত ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ডোজ: আপনার শিশুকে পরবর্তী সময়ে, সাধারণত ১৫-২৪ মাস বয়সে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। কখন শিশুকে টিকা দেওয়া উচিত, তা বুঝতে আপনি চিকিৎসকের কাছে জাতীয় টিকাদান সূচি সম্পর্কে জানতে পারেন অথবা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য দেখে নিতে পারেন।
শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখলে কী করবেন
হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়, যা পরে ফুসকুড়িতে রূপ নেয়। আপনার শিশুর মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। এই রোগের চিকিৎসা এবং জটিলতা এড়ানোর জন্য দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রোধ করতেও সহায়ক হবে।
চিকিৎসককে দেখানোর আগ পর্যন্ত আপনার শিশুকে বাড়িতে অসুস্থ নয় এমন সদস্যদের থেকে দূরে রাখুন। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন নিন এবং চিকিৎসা চালিয়ে যান।
হামের ওষুধ ও চিকিৎসা
হাম নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যায় না। যেসব উপসর্গ দেখা দেবে, সেগুলো উপশমে চিকিৎসা দেওয়া হবে। আর শিশুর শরীর নিজেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
হাম আক্রান্ত শিশুর যত্ন কীভাবে নেবেন
আপনার শিশুর যদি হাম হয় এবং চিকিৎসক তাকে বাড়িতে রেখে সুস্থ করার পরামর্শ দেন, তাহলে আপনি নিম্নলিখিতভাবে তার যত্ন নিতে পারেন—
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে সহায়তা করুন: আপনার শিশুকে বেশি করে ঘুমাতে দিন এবং বিশ্রামে রাখুন।
- শরীর হাইড্রেটেড রাখা: শিশুকে পর্যাপ্ত পানি বা তরল পান করতে উৎসাহিত করুন, যাতে পানিশূন্যতা দেখা না দেয়। ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীর থেকে যে তরল কমে যায়, তা পূরণ করতে খাবার স্যালাইন (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট-ওআরএস) ব্যবহার করা যেতে পারে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা: যদি নিউমোনিয়া বা চোখের সংক্রমণের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়, তবে সেগুলো ঠিকভাবে ব্যবহার করুন।
- বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া: যদি আপনি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তা অব্যাহত রাখুন।
- সুস্থ ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া: পুষ্টিকর খাবার শরীরকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। যদি আপনার শিশু অপুষ্টিতে ভোগে তাহলে তাকে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হবে। শিশুর উপসর্গ যদি খারাপের দিকে যেতে থাকে, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
ভিটামিন ‘এ’-এর গুরুত্ব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ করে যে, হাম আক্রান্ত সব শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন ‘এ’র দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। চিকিৎসক এটা দেবেন। ভিটামিন ‘এ’ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সী শিশু এবং যেসব এলাকায় অপুষ্টি বেশি, সেখানে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি
হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় গত ২০ এপ্রিল দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোয় সকাল আটটা থেকে দেশের সব স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা, ৪টি সিটি করপোরেশনসহ সব এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। কর্মসূচি চলবে আগামী ১২ মে পর্যন্ত।
তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ



