ছবি: ফ্রিপিকবিয়ের কাবিননামায় দেনমোহরের ঘরে একটা বড় অঙ্ক লেখা হয়। পাঁচ লাখ, দশ লাখ, কখনো আরও বেশি। বর স্বাক্ষর করেন, কাজি সাক্ষ্য লেখেন, অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই অঙ্কের টাকা কি দেওয়া হয়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উত্তর— না। দেওয়ার নিয়তও নেই, চাওয়ার প্রত্যাশাও নেই। কাগজে লেখা একটা সংখ্যা, যার কাজ মূলত সামাজিক মর্যাদা জানান দেওয়া। এই সংস্কৃতি কোথা থেকে এল, এবং এটা আসলে কার ক্ষতি করছে?
ইসলামে দেনমোহরের প্রকৃত অর্থ
দেনমোহর বিয়ের একটি আবশ্যিক শর্ত—স্বামী স্ত্রীকে যা দেবেন সম্মান ও উপহার হিসেবে। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা নারীদের তাদের দেনমোহর খুশি মনে দিয়ে দাও।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৪) এটি নারীর আইনগত অধিকার, তার নিজস্ব সম্পদ। এতে পিতা বা স্বামীর হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
পরিমাণের প্রশ্নে ইসলামের অবস্থান হলো, সামর্থ্য অনুযায়ী, যা বাস্তবে পরিশোধযোগ্য। নবীজি (সা.) বলেছেন, সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটা যা সবচেয়ে সহজে সম্পন্ন হয়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৫২৯)
আরও পড়ুন: এক ইহুদি পণ্ডিতের ইসলাম গ্রহণের কাহিনি (০১ জুলাই ২০২৬)
সাহাবির উদাহরণ: সামর্থ্যের গুরুত্ব
সহিহ বুখারিতে একটি ঘটনা আছে। এক দরিদ্র সাহাবির কাছে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। নবীজি (সা.) তাকে বললেন লোহার একটি আংটি আনতে। সেটাও সম্ভব না হলে, জানা কোরআনের কিছু অংশ স্ত্রীকে শেখানোকেই মোহরানা হিসেবে গ্রহণ করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১২১)
আজকের সমাজে দেনমোহরের অপব্যবহার
আজকের সমাজে দেনমোহর অনেকটা পারিবারিক আভিজাত্যের পরিমাপক হয়ে উঠেছে। কনের পরিবার বড় অঙ্ক চায়, সামাজিক মর্যাদার জন্য, কখনো ভবিষ্যৎ সুরক্ষার হিসেবে। বর রাজি হন—কারণ না রাজি হলে বিয়ে হবে না। কিন্তু দেওয়ার ইচ্ছা নেই, সামর্থ্যও নেই। ফলে বিয়ের শুরু থেকেই একটা অসততা থেকে যায় সম্পর্কের ভেতরে।
এই বড় অঙ্কের দেনমোহর অনেক সময় কাজ করে একটা আইনি অস্ত্র হিসেবে — বিরোধ হলে হুমকি আসে, ডিভোর্সের আশঙ্কায় চাপ থাকে। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক যদি আস্থার জায়গায় না দাঁড়িয়ে ভয় বা আর্থিক চাপে দাঁড়ায়, সেটা সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বলই করে।
পরিশোধ না করার গুরুতর পরিণতি
দেনমোহর দেওয়ার ইচ্ছা ছাড়া বিয়ে করাকে ইসলাম গুরুতরভাবে দেখে। মুসনাদে আহমাদে একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি মোহর পরিশোধের নিয়ত ছাড়াই বিয়ে করে, সে আল্লাহর কাছে ধোঁকাবাজ হিসেবে গণ্য হবে। হাদিসটির সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবে ‘প্রতিশ্রুতি দিয়ে না রাখা অসততা—এই মূল নীতিতে কোনো মতভেদ নেই।
আরও পড়ুন: মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক: ইসলাম যেভাবে মূল্যায়ন করে (৩০ জুন ২০২৬)
উভয়পক্ষের দায়িত্ব
সমস্যাটা আসলে দুদিক থেকে। অবাস্তব অঙ্ক চাওয়া হলে পুরুষের পক্ষে পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর অসম্ভব অঙ্ক জেনেও চুক্তি করলে সেই প্রতিশ্রুতি শুরু থেকেই ফাঁকা।
কোরআনে বিয়ের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে প্রশান্তি, ভালোবাসা আর দয়া—“তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা রুম, আয়াত: ২১) এই তিনটির কোনোটাই টাকার অঙ্কে পরিমাপ হয় না।
প্রকৃত নিরাপত্তা কোথায়?
দেনমোহরের উদ্দেশ্য ছিল নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটা বাস্তব, পরিশোধযোগ্য অঙ্কের মাধ্যমে। সেটাকে যখন সামাজিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে তোলা হয়, তখন আর সেই উদ্দেশ্যটাই থাকে না। একটা মেয়ের প্রকৃত নিরাপত্তা কাগজে লেখা কোটি টাকার সংখ্যায় নেই—যে টাকা কখনো দেওয়া হবে না, চাওয়াও হবে না। নিরাপত্তা আসে সম্পর্কের বিশ্বাস থেকে, এবং সেই বিশ্বাসের শুরু হওয়া উচিত বিয়ের প্রথম দিন থেকেই—একটা সৎ, বাস্তব প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে।
আরও পড়ুন: হজরত খাদিজা (রা.)-এর বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন (১৭ জানুয়ারি ২০২৬)



