শহুরে উদ্যান হোক বা কোনো বুনো মেঠো পথ, সবুজের মধ্যে কিছুটা সময় কাটানো, অলস হেঁটে বেড়ানো মুহূর্তেই দূর করে কাজের ক্লান্তি। আমরা ভাবি, এই প্রশান্তি হয়তো মনের ভ্রম। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, প্রকৃতি ও আমাদের শরীরের মধ্যে একটি জৈবিক যোগাযোগ আছে।
চারটি উপায়ে প্রকৃতি আমাদের মন ও শরীরের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে
১. মনে প্রশান্তি আনে প্রকৃতি
প্রতি সপ্তাহে ১২০ মিনিট যাঁরা সবুজ পরিবেশে কাটান, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। দৃষ্টিসীমায় ছড়িয়ে থাকা সবুজ, গাছগাছালির বনজ গন্ধ, পাতার মৃদু মর্মর ধ্বনি কিংবা পাখপাখালির কলতান—এসবই আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র বা অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমকে তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক অধ্যাপক ব্যারনেস ক্যাথি উইলিস বিবিসি রেডিও ফোরের একটি পডকাস্টে বলেন, সুন্দর কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে আমরা শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখতে পাই। যেমন রক্তচাপ কমে যাওয়া, হৃৎস্পন্দন ছন্দময় এবং ধীর হয়ে যাওয়া। এসবই শারীরিক প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১২০ মিনিট যাঁরা সবুজ পরিবেশে কাটান, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। প্রকৃতিতে সময় কাটানোর উপকারিতার প্রমাণ এতটাই জোরালো যে কিছু কিছু অঞ্চলে ‘গ্রিন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’–এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ‘গ্রিন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ের মাধ্যমে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তাদের প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কারণ, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য এর চেয়ে ভালো ওষুধ আর নেই।
২. পুনরায় সক্রিয় হয় হরমোন
গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যের চেয়ে ভালো ওষুধ আর নেই। শরীর ও মন প্রশান্ত থাকলে তা হরমোন ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করে। কাজের চাপ ও মানসিক উদ্বেগের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। সুন্দর পরিবেশে সময় কাটানো ও প্রকৃতির সান্নিধ্য এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে সক্রিয় করে, শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানি সাইপ্রেস বা হিনোকি তেলের ঘ্রাণ শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোনের মাত্রা কমায় এবং ভাইরাস-প্রতিরোধী কোষ বা ‘ন্যাচারাল কিলার সেল’-এর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিং কুও বলেন, প্রকৃতি মূলত যা শান্ত করা প্রয়োজন, তাকে শান্ত করে এবং যা শক্তিশালী করা প্রয়োজন, তাকে শক্তিশালী করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রকৃতিতে অল্প সময় কাটালেও শরীর ও মনে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।
৩. ঘ্রাণের শক্তিশালী অনুভূতির প্রভাব
গাছপালা, মাটি বা ফুলের গন্ধ নিলে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে কিছু অণু রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে মনে স্নিগ্ধ অনুভূতি জাগায়। শুধু দেখা বা শোনার মাধ্যমেই নয়, ঘ্রাণের মাধ্যমেও প্রকৃতিকে অনুভব করা যায়। আমরা যে গাছপালা ও মাটির গন্ধ নিই, তার সঙ্গে উদ্ভিদ নির্গত জৈব যৌগ মিশে থাকে। আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে কিছু অণু রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে মনে স্নিগ্ধ অনুভূতি জাগায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পাইনবনের গন্ধ মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে মনকে শান্ত করে তুলতে পারে এবং এই প্রভাব প্রায় ১০ মিনিট স্থায়ী হয়। কেবল বড়রাই নন, খুব ছোট শিশুদের মধ্যেও গন্ধের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। শিশুরা, যাদের নির্দিষ্ট কোনো গন্ধের সঙ্গে কোনো স্মৃতি জড়িত নেই, তারাও ঘরে লিমোনিন নামক শান্তিদায়ক গন্ধ ছড়িয়ে দেওয়ায় শান্ত হয়ে গিয়েছিল।
৪. অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ
মাটি স্পর্শ করলে শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। মনকে শান্ত করার পাশাপাশি, প্রকৃতি শরীরের উপকারী অণুজীব বা মাইক্রোবায়োমকেও উন্নত করতে সাহায্য করে। কারণ, মাটি ও গাছপালা উপকারী ব্যাকটেরিয়ায় পূর্ণ থাকে। মাটি স্পর্শ করলে শরীরে এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। মানুষের ত্বকে ও অন্ত্রে কোটি কোটি উপকারী জীবাণু বাস করে, যা খাদ্য হজম, ভিটামিন তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা অনেক সময় টাকা দিয়ে প্রোবায়োটিকস কিনে খাই। অথচ প্রকৃতি থেকে বিনা মূল্যে এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো পেতে পারি। উদ্ভিদ থেকে নিঃসৃত জীবাণুনাশক রাসায়নিক পদার্থ—যাকে ফাইটনসাইড বলা হয়—রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। মাটির সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক বলিষ্ঠ হয়।
প্রকৃতিকে নিজের কাছাকাছি আনুন
প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে চাইলে ঘরে সবুজ গাছ রাখুন। যতই ইচ্ছা করুক, সবাই হুট করে জঙ্গলে চলে যেতে পারে না। কর্মব্যস্ত জীবন সব সময় আমাদের সে অবকাশ দেয় না। তবে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে চাইলে ঘরে থেকেও তা নেওয়া সম্ভব। ল্যাপটপে প্রকৃতির ছবিযুক্ত স্ক্রিনসেভার, ঘরের জানালায় রাখা সাদা বা হলুদ রঙের গোলাপ মস্তিষ্কের কার্যকলাপে প্রশান্তিদায়ক প্রভাব ফেলে। পাইন তেলের মতো এসেনশিয়াল অয়েলযুক্ত ডিফিউজার, মন ভালো করা সুগন্ধ বা দেয়ালে একটা সবুজ বনের বাঁধানো ছবি—এই ছোট ছোট উপকরণগুলোও মনের চাপ কমাতে ওষুধের মতো কাজ করে।



