সমাজের ভয় ও সহিংসতা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
সমাজের ভয় ও সহিংসতা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

খবরের কাগজ পড়লে ও চারপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায় যে আমাদের দেশের বাতাসে সারাক্ষণ এক অদৃশ্য ভয় ভেসে বেড়ায়। এটা রাতে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটার সময় হাইজাকারের ভয় নয়। এই ভয় নিজের ঘরের ভেতর, নিজের মনের মধ্যে। পরিচিত মানুষদেরকেই আমরা ভয় পাই। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীকে ভয় পাই। নিজের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে তারা ফিরে আসবে কিনা সেই ভয়। আমরা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি যে আমরা এখন আর শুধু মৃত্যুর ভয়ে শঙ্কিত নই, আমরা কাছের মানুষটাকেও ভয় পাচ্ছি।

মানুষের ভয় ও বিচারহীনতা

মানুষদের যখন বলতে শুনি ‘আল্লাহ তুই দেহিস’ এবং ‘আমি বিচার চাই না; আপনারা বিচার করতে পারবেন না’, তখন ভয়টা আমাদের মনে আরও বেশি জেঁকে বসে।

আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে—আমরা মানুষ খুন ও ধর্ষণকে নিছক ‘সংবাদ’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ খুলে গলা কাটা মরদেহ, শিশুহত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা, পরিবারের সদস্যের হাতে খুনের সংবাদ দেখে আমরা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হই। তারপরই চা-নাশতা খেয়ে অফিসে যাই, সামাজিক মাধ্যমে হাসির রিল দেখি, যেন কিছুই ঘটেনি। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বিপদের কারণ হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অসুস্থ সমাজের উপসর্গ

একটু ভাবলেই বুঝতে পারি যে এগুলো একটা অসুস্থ সমাজের উপসর্গ। আরও ভেবে বুঝতে পারি, আমি নিজেও সুস্থ নই। তবে অসুস্থতাটা কোথায় তা বুঝে উঠতে সময় লাগে। রোগটা কী? এমনটা শুধু কি আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা ও বিচারহীনতার কারণেই হচ্ছে? পর্নোগ্রাফি দেখাই কি ধর্ষণের প্রধান কারণ? মাদক এবং যৌন-উত্তেজক ওষুধের অতি-প্রচলন? পশ্চিমা সংস্কৃতি টিভি-সিনেমায় দেখে আমাদের বিকৃতি ঘটছে? নাকি গভীর কোনও মানসিক, সামাজিক ও সভ্যতাগত ভাঙন কাজ করছে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমাদের সমাজে এমন অস্বাভাবিক উদাহরণ অনেক, গুনে শেষ করা যাবে না। যদি প্রশ্ন করি, একজন মানুষ এমন কাজ কীভাবে করতে পারে, তার উত্তর আইন দিতে পারবে না। আইন বিচার করতে পারে এবং শাস্তি দিতে পারে। শাস্তি তো দিতেই হবে, কিন্তু একজন মানুষ কীভাবে এমন দানব হয়ে উঠছে, তার উত্তর পেতে গেলে আমাদের একটা শিক্ষিত ও পরিণত সমাজে উপনীত হতে হবে। কিন্তু আমরা তা নই; মনে হয় আমরা তা হতেও চাই না।

মনের ভেতরের রাগ ও হতাশা

আমাদের সবার মনের ভেতরে কি অনেক রাগ জমে আছে? সেই রাগ কি এমন পর্যায়ে গেছে যে আমরা সামলাতে পারছি না? আমরা কি সবাই রাগান্বিত? সবাই হতাশ? সবাই ক্লান্ত? বেকারত্ব, সংসারে অর্থনৈতিক চাপ, শ্রেণিবিভেদের অপমান, ব্যর্থতা, সম্পর্কের ভাঙন, রাজনৈতিক অবক্ষয়—এসব পুঞ্জিভূত হয়ে আমাদের ভেতরটা কি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে? এবং সেই অন্ধকারের বিস্ফোরণ ঘটছে শিশুদের ওপর, কখনও স্ত্রীর সঙ্গে, কখনও স্বামীর ওপর, কখনও প্রতিবেশীর সঙ্গে?

পরিবারের ভাঙন ও বিচ্ছিন্নতা

খবরের কাগজে একটা বিষয় বারবার উঠে আসছে– আমাদের পরিবারগুলো নাকি ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবার ভাঙলেই কি সমাজ ভেঙে যাবে? না, আমার মনে হয় সমাজ ভাঙবে না, তবে বিবর্তিত হবে। ভাঙছে কি ভাঙছে না তা নিয়ে কে চিন্তা করছে? ভাঙন ঠেকাতে আমার কী করতে হবে, সেই ভাবনা কেউ ভাবছি? না, আমরা কেউ চিন্তা করছি না। পরিবার শুধু আইনগত একটা প্রতিষ্ঠান নয়—পরিবার আমাদের মানসিক আশ্রয়। পরিবারে আমরা নিজের ভয়, ব্যর্থতা, কষ্ট, অপমান সব ভাগ করে নিই।

কিন্তু এখন একই বাড়িতে বসবাস করেও আমরা বিচ্ছিন্ন। বাবা ফোনে, মা টিভি দেখছেন, সন্তান গেম খেলছে। কথোপকথন নেই। সংযোগ নেই। আমরা একা হয়ে গেছি। এবং আমরা সবাই জানি যে একা মানুষ ভয়ংকর অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের বলতে শুনেছি, দীর্ঘ একাকিত্ব আমাদের সহানুভূতি ধ্বংস করে দিতে পারে। যখন আমরা অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারাই, তখন সহজেই হিংস্র হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক। আমরা কি তাহলে এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি? কারণ যে সমাজে একজন শিশুর কান্না আমাদেরকে আর গভীরভাবে নাড়া দেয় না, সেখানে সহানুভূতির মৃত্যু ঘটেছে বলেই আমরা মনে করবো। একজন-দুজন শিশু নয়, তারা সংখ্যায় অনেক।

সহিংসতা কি নিউ-নরমাল?

আমরা কি সহিংসতাকে নিউ-নরমাল মনে করছি? আমাদের রাজনীতির ভাষা সহিংস। আমাদের টকশো সহিংস। সামাজিক মাধ্যম গালিগালাজে পরিপূর্ণ। পারিবারিক সম্পর্কে অসহিষ্ণুতা। স্কুলে বুলিং। রাস্তাঘাটে মানুষে-মানুষে মারামারি। আমাদের সন্তানেরা শিখেছে, ক্ষমতা মানে ভয় দেখানো, জিতে যাওয়ার অর্থ আরেক পক্ষকে ধ্বংস করা, প্রতিশোধ নেওয়া, দুর্বলের গলা আরও বেশি চেপে ধরা। আমরা কি চিন্তা করছি কেন একজন কিশোর ধর্ষক হয়ে উঠছে? কেন একজন বাবা নিজের সন্তানকে আছড়ে হত্যা করছে? কেন একজন স্বামী গর্ভবতী স্ত্রীকে জবাই করছে?

এমন পরিস্থিতিতে, অপরাধ ঘটতে দেখে ক্ষণিকের জন্যে উত্তেজিত হয়ে কোনও পত্রিকায় দু’কলম লিখে কোনও পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেই আমার মনে হয়। আমাদের সমাজ এখন একটা অপরাধ তৈরির কারখানা।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে—অনেক মামলাও হয়, কিন্তু নির্যাতিত মানুষ সঠিক বিচার পাচ্ছেন কিনা সেই কথাগুলো আমাদের সামনে আসে না। আমরা অনেকবার এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যেতে শুনেছি। এগুলোকে যখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হয়, আমরা বুঝতে পারি—এটা আমাদের ভেতরের অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের সমাজ এক অদ্ভুত দ্বৈত আচরণের মধ্যে আটকে আছে। আমরা সারাক্ষণই ধর্ম, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সম্মানের কথা বলে বুলি ওড়াচ্ছি, কিন্তু আমাদের মনের ভেতরে জেঁকে বসে আছে ভয়ংকর রাগ, যৌন বিকার, হতাশা, ঈর্ষা, লোভ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। আমাদের সন্তানকে নৈতিকতার কথা শেখাচ্ছি, কিন্তু নিজেরাই ঘুষ নিচ্ছি এবং দিচ্ছি। নিজেরা শালীনতার কথা বলছি, কিন্তু নিজের বাড়িতে আরেকজনকে অপমান করছি। ধর্মের কথা বলছি, কিন্তু দুর্বল মানুষদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছি না। এই ভন্ডামির মধ্যেই বড় হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা।

শাস্তি বনাম প্রতিরোধ

খবরে বলা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করছে। এটা নিঃসন্দেহে সত্য কথা। হত্যা মামলার বিচার ১৫-২০ বছর ঝুলে থাকে। সাক্ষী হারিয়ে যায়। বাদী মারা যায়। অপরাধী জামিনে বের হয়ে যায়। সমাজ যখন দেখে এমন করে পার পাওয়া যায়, তখন আইন তার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে।

ধরুন কিন্তু ধর্ষকদের অনেক কঠোর শাস্তি দেয়া হলো। কিন্তু তাতে কি ধর্ষণ কমে যাবে? বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারপরও তো এই অপরাধ কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়ে গেছে। কারণ অপরাধী ভাবছে, যেহেতু শাস্তি একই, তাহলে সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখবো কেন? এটা এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। প্রতিশোধভিত্তিক বিচার করে তো প্রতিরোধ-ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারছি না।

শিক্ষার বিকল্প পথ

ইতালি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এইসব দেশে সেক্সুয়ালিটি শিক্ষা, যৌনমিলনে সম্মতি শিক্ষা, মানবিক আচরণ শিক্ষা স্কুলে শেখানো হয়। আমাদের এখানে সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কথা বলাই একটা পাপ। আমরা এ নিয়ে কথা বলতে ভয় পাই। ফলে শিশুরা শেখে ইন্টারনেট থেকে—মাঝে মাঝে পর্নোগ্রাফি থেকে। সেখানে নারী মানুষ নয়, বস্তু। সেখানে সম্পর্ক নয়, আধিপত্য প্রাধান্য পায়। মিলন নয়, আক্রমণই বিনোদন।

এসব ঘটছে এবং আমরা অবাক হয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছি– ‘আহারে, সমাজ কেন আগের মতো নেই? কেন সবাই সহিংস হয়ে উঠছে?’

মানসিক শূন্যতা ও প্রতিযোগিতা

এই সমাজে কোন মানুষটার মনে আনন্দ আছে? এখন তো আমরা শুধু প্রতিযোগিতায় উন্মত্ত। চাকরি। টাকা। বাড়ি। গাড়ি। সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে জাহির করা। সবাই নিজেকে সফল প্রমাণ করতে চাই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা ভেঙে পড়ছি তা টের পাচ্ছি না। তরুণরা হতাশ। বিবাহিত মানুষ ক্লান্ত। শিশুদের শৈশব হারিয়ে গেছে। কেউ কাউকে সময় দিচ্ছি না। ফলে সমাজে এক মানসিক শূন্যতা জমেছে।

একজন সাইকোলজিস্টকে বলতে শুনলাম– ‘শিশু হত্যার পেছনে শুধু একজন অপরাধী নয়, ব্যর্থতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস থাকে।’ এই কথাটা মনকে বেশ নাড়া দিয়েছে। সত্যিই তো। কার ব্যর্থতা? ব্যর্থ পরিবার, ব্যর্থ শিক্ষা, ব্যর্থ সমাজ, ব্যর্থ নৈতিকতা– এই সবই কি ব্যর্থ?

প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা

আমাদের মনে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেছে। কেউ অপরাধ করলে আইনের প্রতি আস্থা না রেখে পিটিয়ে হত্যা করছি। কেন? কারণ আমরা বিশ্বাস হারিয়েছি। এখন আমরা নিজেরাই বিচারক হতে চাইছি। বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়া আরেক নতুন হিংস্রতা।

মনে হয়, আমরা সমাজে নীতিবাক্যের ক্লান্তি ভর করেছে। আমরা ভালো মানুষ হতে চাই, কিন্তু পরিবেশ আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। আমরা নিরাপদ থাকতে চাই, কিন্তু সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু মানুষদের প্রতারণা আমাদের অবিশ্বাসী করে তুলেছে। এগুলোই এখন স্বাভাবিক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক