হামে আক্রান্ত শিশুর অবস্থার অবনতি, আইসিইউতে স্থান পেলেও শঙ্কা কাটেনি
হামে আক্রান্ত শিশু আইসিইউতে, শঙ্কা এখনও কাটেনি

হামে আক্রান্ত দেড় বছর বয়সী শিশু আবদুল্লাহর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। দ্রুত তাকে আইসিইউতে নেওয়ার তাগাদা দিচ্ছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু আইসিইউতে শয্যা না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে তার চিকিৎসা চলে। পরে আজ দুপুরে আইসিইউতে একটি শয্যা খালি হওয়ার পর সেখানে তার জায়গা হয়।

আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে দেখা যায়, রোগীর চাপ বেশি থাকায় হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে সেখানে রেখে শিশু আবদুল্লাহর চিকিৎসা করানো হচ্ছে। তার মুখে ক্রিম লাগিয়ে দিচ্ছিলেন মা সুমা আক্তার। আর অসহায় দৃষ্টিতে ছেলের পাশেই বসা ছিলেন বাবা সাইফুল ইসলাম। শিশুটির ঠোঁটে, মুখে হামের ফুসকুড়িতে ঘা হয়ে গেছে। আর তাতেই ক্রিম লাগিয়ে দিচ্ছিলেন সুমা আক্তার।

কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? এই প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে তাকালেন আবদুল্লাহর বাবা সাইফুল। জানালেন, তাঁর ছেলে আবদুল্লাহর ১০ দিন আগে জ্বর এসেছিল। দুদিন বাসায় রেখে জ্বরের ওষুধ খাওয়ানোর পর সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখতে পান। তাড়াহুড়ো করে সেদিনই ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে এসে জানতে পারেন, ছেলের হাম হয়েছে। দুদিন ভর্তি থাকার পর বাচ্চার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, পরে তাকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) নেওয়া হয়। তিন দিন আইসিইউতে রাখার পরেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। একপর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাচ্চাকে ডিএনসিসি হাসপাতাল থেকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। হাসপাতালটির চারতলায় বাচ্চাটির চিকিৎসা চলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবারের অবস্থা

সাইফুল ইসলাম ১০ বছর ধরে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান তিনি। তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম মো. আলিফ, বয়স ছয় বছর। আর ছোট ছেলে আবদুল্লাহর বয়স মাত্র ১৮ মাস।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আজ শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তাঁর বড় ছেলে আলিফও হামের উপসর্গ নিয়ে ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাঁর শাশুড়ি বড় ছেলের দেখাশোনা করছেন। আর স্ত্রীকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছোট ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

ছোট ছেলের অবস্থা ভালো নয় বলে জানালেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, অবস্থা বেশি ভালো নয়। সারা শরীরে ফুসকুড়ি বেরিয়েছে। ঠোঁট ও মুখের অবস্থা বেশি খারাপ। মুখের ফুসকুড়ি ফেটে ঘা হয়ে গেছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন ছাড়া শ্বাস নিতে পারছে না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে আবার আইসিইউতে নিতে হবে। অনেক অনুরোধ করেও আইসিইউতে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতে রেখে শুধু অক্সিজেন লাগিয়ে রেখেছেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, 'গতকাল বিকেলে আবদুল্লাহর অবস্থা এতই খারাপ ছিল, মনে হচ্ছিল ছেলেটা বুঝি আর নেই। শ্বাস নিতে পারছিল না। আমরা তো কান্নাকাটি শুরু করেছি। ডাক্তারকে জানানোর পর তাড়াতাড়ি করে একটা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তারপর থেকে অক্সিজেন চলছে।'

বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, 'ডাক্তাররা বারবার বলছে, অবস্থা বেশি ভালো না, দ্রুত প্রাইভেট হাসপাতালের আইসিইউতে নিতে। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার তো অনেক খরচ। আমি অটোরিকশা চালাই। এত খরচ কীভাবে জোগাড় করব?'

ছোট ছেলের চিকিৎসায় দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে বড় ছেলের খোঁজও নিতে পারছেন না সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, শাশুড়িকে ফোন করে শুনেছেন বড় ছেলের অবস্থা কিছুটা ভালো। দুই হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন তিনি।

পরে বেলা দেড়টার দিকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নিচতলায় জরুরি বিভাগের সামনে আবার দেখা হয় সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তখন তিনি বললেন, 'আইসিইউতে একটা সিট ফাঁকা হয়েছে। ছোট ছেলেকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অবস্থা বেশি ভালো না। ওনারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আমরাও অপেক্ষা করছি আর আল্লাহকে ডাকছি।'

হাসপাতালে চাপ

শুধু সাইফুলের সন্তানই নন, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে পঞ্চাশটির বেশি শিশু চিকিৎসাধীন। হাসপাতালটির পাঁচ, ছয় ও সাততলায় এসব শিশুর চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে পাঁচতলায় রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও উচ্চনির্ভরতা ইউনিট (এইচডিইউ)।

দুপুরে হাসপাতালের ছয়তলায় সাধারণ ওয়ার্ডে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি শয্যায় শুয়ে আছে অসুস্থ শিশুরা। শয্যাসংকটে মেঝেতে বিছানা পেতেও শুয়ে আছে কয়েকটি শিশু। কারও মুখে ও গায়ে রয়েছে লালচে ফুসকুড়ি। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউবা কান্না করছে। কোনো কোনো শিশুকে নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে। আর তাতেই শিশু আরও কান্না করে উঠছে। তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা। কর্তব্যরত নার্সদেরও চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

ছয়তলার সাধারণ ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দায় একটি বেডে চিকিৎসাধীন আড়াই মাসের শিশু ফারিশ। পাশে বসে আছে শিশুটির দাদি জোহরা বেগম (৪৫)। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে এসেছেন তাঁরা। নরসিংদী, রায়পুরার তিনটি হাসপাতাল ঘুরে ঢাকায় এসেছেন। জোহরা বেগম জানান, চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁর নাতির বুকে কফ জমে আছে, রক্তেও ইনফেকশন হয়েছে। তিন দিন ধরে চিকিৎসা চলছে।

ঢাকার বাইরের শিশুরা বেশি আসছে

দুপুরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে সাত শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময় সেখানে কারও মৃত্যু হয়নি। মোট ৫৪টি শিশু ভর্তি আছে। এদের মধ্যে ১২টি শিশু আইসিইউ ও এইচডিইউতে আছে।

আসমা খান আরও জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১ হাজার ৪৫টি শিশু ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৮৮৮টি শিশু চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে ৪০টি এবং নিশ্চিত হামে ৭টি শিশু মারা গেছে।

এফ এ আসমা খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সব জেলা থেকেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসছে। তবে ঢাকার বাইরের শিশুই বেশি আসছে। হাসপাতালটিতে প্রথম দিকে মারা যাওয়া ৩৬ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণে ৩০ জনই ঢাকার বাইরের বলে জানান তিনি।

আগামী এক মাস পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন আসমা খান। তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত হাম পরিস্থিতি ওঠানামা করছে। একবার জ্বর, সর্দি ভালো হওয়ার পরে দ্বিতীয় দফায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে আগামী এক মাস খুবই ক্রিটিক্যাল সময়। ঈদে বাচ্চারা এলাকা পরিবর্তন করবে। এতে সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে।'