দুপুর ১২টা। মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে একের পর এক আসছে হামে আক্রান্ত শিশুরা। কেউ অ্যাম্বুলেন্সে, কেউ সিএনজি-রিকশায়, আবার কেউবা পায়ে হেঁটে কোলে করে নিয়ে আসছেন তাদের অসুস্থ সন্তানকে। এদেরই একজন নুরুন্নাহার। হাসপাতালের বহির্বিভাগের চেয়ারে মিমকে (৭) কোলে নিয়ে বসে আছেন তিনি। দুই দিন ধরে তীব্র জ্বর ও শরীরে র্যাশ ওঠার পর অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।
তবে নুরুন্নাহারের কষ্টের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এক সপ্তাহ ধরে তার পরিবারে চলছে এক দুঃসহ যাতনা। তার চার সন্তান একে একে হামে আক্রান্ত হয়েছে। একজন একটু সুস্থ হওয়ার আগেই আরেকজন ঢলে পড়ছে হাসপাতালের বিছানায়।
মায়ের বর্ণনায় অসহায়ত্ব
কথা বলতে এগিয়ে গেলে মা নুরুন্নাহার জানান, তার মেয়ের হাম হয়েছে। তিনি বলেন, “দুই দিন ধরে জ্বর। কাল থেকে শরীরে র্যাশ উঠছে। রাতে বমি, কাশি আর জ্বর বেড়ে গেছে। সকালে আর বসে থাকতে পারি নাই, তাই হাসপাতালে নিয়ে আসছি।” কথা বলতে বলতেই কেঁপে ওঠে তার গলা। চোখ ভিজে আসে।
“আমার পাঁচ মেয়ে, এক ছেলে,” বলেন নুরুন্নাহার। তবে কোলে থাকা মিমই একমাত্র হামে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ সন্তান নয়। হাসপাতালের চতুর্থ তলায় ৪০ ও ৪২ নম্বর বেডে ভর্তি রয়েছে তার আরও দুই সন্তান। আর ১৪ মে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে আরেক সন্তান।
“আমার চারটা সন্তানই হামে আক্রান্ত হয়েছে। একজন একটু ভালো হওয়ার আগেই আরেকজন অসুস্থ হয়ে যায়। এক সপ্তাহ ধরে এমনই চলছে,” বলেন তিনি।
পরিবারের দুঃস্বপ্নের শুরু
নুরুন্নাহার জানান, তার বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাদের সংসার। এই দুঃস্বপ্নের শুরু প্রায় এক সপ্তাহ আগে। তার নয় বছরের মেয়ে বাবুনির হঠাৎ জ্বর আসে। সঙ্গে পাতলা পায়খানা, ঠান্ডা ও কাশি। প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়।
“ভাবছিলাম ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরে শরীরে হাম বের হয়,” বলেন তিনি। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ১১ মে বাবুনিকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, তার হাম হয়েছে। টানা চার দিনের চিকিৎসায় বাবুনির শরীর কিছুটা সুস্থ হতে শুরু করে। কিন্তু স্বস্তি আসার আগেই হামে অসুস্থ হয়ে পড়ে আরেক সন্তান।
বাবুনিকে হাসপাতালে ভর্তি করার একদিন পরই ১০ বছরের মুরসালিনার শরীরেও হামের উপসর্গ বাড়তে থাকে। ১২ মে তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। “ওকেও তিন দিন ফার্মেসির ওষুধ খাওয়াইছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি,” বলেন মা।
এক বিছানা, একের পর এক রোগী
১৪ মে বাবুনি হাসপাতাল থেকে রিলিজ পায়। কিন্তু সেদিনই তাদের একমাত্র ছেলে ১৪ বছরের মোসলিমের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দেয়। বাবুনি যে বেড ছেড়ে যায়, একই দিনে সেই বেডেই ভর্তি করা হয় মোসলিমকে। মোসলিমের মুখে ঘা, চোখ হলুদাভ, পুরো শরীরে হাম ছড়িয়ে পড়েছে।
“কিছুই খেতে পারি না। ওষুধ খেতেও কষ্ট হয়,” দুর্বল কণ্ঠে বলে সে। “শুধু শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।”
অপরদিকে শুক্রবার ছাড়পত্র পাওয়ার কথা ছিল মুরসালিনার। জ্বর কমলেও শরীর এতটাই দুর্বল যে সামনে খাবারের প্লেট দেখলেই বমি আসে। হাম কমে গেলেও মুখ ড্রাই হয়ে আছে, চামড়া উঠতেছে।
মুরসালিনা হাসপাতাল ছাড়ার আগেই শুক্রবার সকালে নুরুন্নাহার হাসপাতালে নিয়ে আসেন মিমকে। মিমের জ্বর, কাশি আর অনবরত বমি হচ্ছিল। চোখের রং হলদে-লাল এবং ফুলে আছে। শুক্রবার সকালে বহির্বিভাগে দেখানোর পর তারা মিমকে ওষুধ দিয়েছে।
সেই ওষুধ খাওয়াতে কখনও পাউরুটির সঙ্গে, কখনও বিস্কুটের সঙ্গে, কখনও পানিতে মিশিয়ে চেষ্টা করেন বাবা-মা। কিন্তু ওষুধ মুখে নিলেই বমি করে দিচ্ছিল মিম। দুর্বল শরীর নিয়ে বারবার বিছানায় ঢলে পড়ছিল সে।
মিমের মা জানান, “ও শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে চায়, একটু ঘুমাইতে চায়। খাবার দিলেই বমি করে ফেলে।” শেষ পর্যন্ত পানিতে গুলিয়ে বমি বন্ধের একটি ওষুধ খাওয়ানো গেলেও বাকি ওষুধ আর খেতে পারেনি মিম। নিস্তেজ শরীরে চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিল হাসপাতালের বেডে।
শেষ হচ্ছে না দুর্ভোগ
তবুও যেন শেষ হচ্ছে না পরিবারের দুর্ভোগ। নুরুন্নাহার জানান, তার বড় মেয়ের দেড় বছরের ছেলে আব্দুর রহমানও বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চোখ ফুলে গেছে, তীব্র জ্বর। পরিবার এখন আশঙ্কা করছে, সেও হয়তো হামে আক্রান্ত।
এদিকে শুক্রবার সকালে আরেক মেয়ে শ্রাবণী ফোন করে জানিয়েছেন, তারও জ্বর ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে এর আগের দিন থেকে।
“এক সপ্তাহ ধরে আমার সন্তানরা একজনের পর একজন অসুস্থ হচ্ছে,” বলেন নুরুন্নাহার। “মা হয়ে নিজের সন্তানের এই কষ্ট দেখা যে কতটা কঠিন, সেটা কাউরে বুঝাইতে পারবো না।”
“এক সপ্তাহ ঘুম নাই। ঠিকমতো খাওয়াও নাই। শুধু বাচ্চাগুলারে নিয়ে হাসপাতাল আর বাসায় দৌড়াদৌড়ি করছি। সারাক্ষণ মনে হয়, এই বুঝি আরেকজন অসুস্থ হইলো।”
আর্থিক সংকটে পরিবার
শুধু মানসিক কষ্ট নয়, এই অসুস্থতা তাদের পরিবারকে ফেলেছে ভয়াবহ আর্থিক সংকটেও। নুরুন্নাহার বাসাবাড়িতে কাজ করেন। তার স্বামী মোস্তফা কখনও রিকশা চালান, কখনও আচার বিক্রি করেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে কেউই কাজে যেতে পারছেন না। তিনি জানান, নরসিংদীর রায়পুরাতে তাদের গ্রামের বাড়ি। গ্রামে ভিটেবাড়ি বলতে কিছুই নেই। আগে মানুষের জায়গায় থাকতেন। করোনার সময় সন্তানদের নিয়ে জীবিকার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন। বর্তমানে নাখালপাড়া বাজারের পাশে রুম ভাড়া নিয়ে থাকেন।
ইতোমধ্যে চিকিৎসার পেছনে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যার পুরোটা ধার করা। “অনেকের কাছে ২০ হাজার টাকা কম মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জন্য এটা পাহাড়সম ঋণ,” বলেন নুরুন্নাহার।
তিনি জানান, যে বাসায় কাজ করেন সেখানকার ‘ম্যাডাম’ এর কাছ থেকেও ধার নিয়েছেন। “বাচ্চারা ছোট। যা দেখে তাই খেতে চায়। হাতে টাকা না থাকলেও তো সন্তানরে না বলতে পারি না,” বলেন তিনি।
হামের কারণে মুখে ঘা হওয়ায় তার সন্তানরা ভাত-তরকারি খেতে পারছে না। শুধু ফল বা জুস খেতে চায়। “গত রাতে মিম আঙুর খেতে চাইছিল। ধার করে আধা কেজি আঙুর আনছি। একটু পর বাবুনি পুরি খেতে চাইছে, সেটাও কিনে দিছি।”
সকালে হাসপাতালের সামনে বসে থাকা অবস্থায় এক জনের হাতে থাকা আমের দিকে চোখ যায় মিমের। “মা, আম কিনে দিবা? আম খাবো,” বলছিল সে। “বলছি কিনে দিবো,” বলেন নুরুন্নাহার। “কিন্তু মিমের জন্য ওষুধ কিনতে যেয়ে সব টাকা শেষ।”
তারপরও থামতে চান না তিনি। “ম্যাডামরে আবার ফোন দিমু। ধার চাইমু। যত ঋণই হোক, আগে আমার বাচ্চাগুলা সুস্থ হোক,” বলেন তিনি।
নুরুন্নাহার আরও জানান, ওয়ার্ডের অন্য শিশুদের হাতে ফল আর জুস বিভিন্ন খাবার দেখে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার সন্তানরা। “আমি বুঝি, আমার সন্তানদেরও খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সব সময় পারি না। সাধ আছে, কিন্তু সব সময় সাধ্যে কুলায় না। আমি জানি, ভালো খাবার খাওয়াইতে পারলে তাড়াতাড়ি বাচ্চারা সুস্থ হইতো। কিন্তু টাকার অভাবে পারি না,” বলেন তিনি।
স্বামীর ভাষ্য
নুরুন্নাহারের স্বামী মোস্তফা জানান, সন্তানরা অসুস্থ হওয়ার আগের দিন তিনি চার হাজার টাকার আচার কিনেছিলেন বিক্রির জন্য। “একটাও বিক্রি করতে পারি নাই। পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে,” বলেন তিনি। তার ভাষ্য, এরই মধ্যে প্রায় দুই হাজার টাকার আচার নষ্ট হয়ে গেছে। “সন্তান অসুস্থ থাকলে কিছুই ভালো লাগে না,” বলেন তিনি।
পাশের বেডের আয়েশা জানান, তিনি কাছ থেকে দেখছেন পরিবারটির সংগ্রাম। “উনার স্বামী রিকশা চালায়, উনি বাসাবাড়িতে কাজ করেন। হাসপাতালের খাবার তাদের জন্য যথেষ্ট না,” বলেন তিনি। “খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে। চোখের সামনে দেখতেছি তারা কী পরিমাণ কষ্ট করতেছে। হাসপাতালের খাবার ছাড়া বাইরে থেকে তেমন কিছু কিনেও খেতে পারছে না। বাচ্চাগুলার মা সন্তানদের টেক-কেয়ার করতে করতে নিজেও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।”
আয়েশার কথা শেষ হতেই পাশে বসে থাকা নুরুন্নাহার নিঃশব্দে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমি শুধু চাই আমার বাচ্চাগুলা সুস্থ হোক। লাগলে আরও ধার করবো। আল্লাহ যেন আমার বাচ্চাগুলোকে সুস্থ করে দেয়। ঋণ পরে শোধ করা যাবে।”



