ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকায় রোগীরাই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ নির্ধারণ করছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সমস্যা বলছেন এবং হাসপাতালের কর্মীরা সেই অনুযায়ী ওষুধ তুলে দিচ্ছেন। কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এভাবে ওষুধ বিতরণ চলছে।
হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা
ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই হাসপাতালটি ২০০৬ সালে নির্মিত হয়। স্থানীয়দের দান করা তিন একর জমিতে দ্বিতল ভবনটি তৈরি। এতে নারীদের জন্য ১২টি ও পুরুষদের জন্য ৮টি শয্যা থাকার কথা। তবে প্রায় দুই দশক পরও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি। বর্তমানে বহির্বিভাগে কিছু ওষুধ বিতরণ ছাড়া কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা নেই।
চিকিৎসকের অনুপস্থিতি
হাসপাতালে পাঁচজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে দুজন কর্মরত। তবে ২৩ এপ্রিল তাদের কাউকেই হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্মীদের ভাষ্য, একজন অসুস্থ এবং অন্যজন জরুরি কাজে বাইরে গেছেন। প্রায় দুই বছর আগে গাইনি চিকিৎসক চলে যাওয়ার পর থেকে প্রসূতি সেবা বন্ধ। বাকি দুই চিকিৎসকও বদলি হয়ে গেছেন।
ওষুধ বিতরণ প্রক্রিয়া
২৩ এপ্রিল দুপুরে দেখা যায়, রোগীরা গেটের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে নাম লেখাচ্ছেন। ওয়ার্ড বয় মো. হাসিম উদ্দিন খাতায় নাম লেখার পর রোগীরা পাশের জানালায় গিয়ে নিজেরাই বলে দিচ্ছেন কী ওষুধ লাগবে। মাস্টার রোলে কর্মরত আয়া শাহিনা আক্তার সেই অনুযায়ী ওষুধ তুলে দিচ্ছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসক রোগী দেখে প্রেসক্রিপশন দেবেন এবং ফার্মাসিস্ট ওষুধ বিতরণ করবেন।
ছাতিয়ানতলা গ্রামের জান্নাত আক্তার বলেন, “ডাক্তার দেহাইছি না। কইছি ওষুধ দিত, ওষুধ দিয়া দিছে।” মুর্শিদা বেগম বলেন, “সকাল ৯টায় আইছি, লোকজন দেরিতে আসে। বড় ডাক্তার আইতে দেহি না। আমরা যা চাই, তা-ই দেয়।”
জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান বলেন, “চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এভাবে ওষুধ দিলে রোগী রোগের সঠিক ওষুধ নাও পেতে পারেন বা ওষুধের পূর্ণাঙ্গ ডোজ মিস হতে পারে।”
হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মিন্টু চন্দ্র দে বলেন, “প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগীর ওষুধ দেওয়া হয়। রোগীরা নিজেদের সমস্যার কথা বলেন, আমরা ওষুধ দিয়ে দিই। অধিকাংশ রোগী প্রেসক্রিপশনের জন্য আসেন না।” তিনি আরও বলেন, “রোগীরা বললে ওষুধ দেওয়ার সুযোগ নেই, কিন্তু যোগদানের পর থেকে এভাবেই চলছে।”
অবকাঠামো ও জনবল সংকট
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, দোতলায় নারী-পুরুষ ওয়ার্ড, নার্স স্টেশন ও অপারেশন থিয়েটার ধুলায় ঢেকে আছে। অপারেশন থিয়েটারে টেবিল নেই, যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দী অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। অন্তর্বিভাগ বন্ধ থাকায় নার্সদেরও কাজ নেই। পাঁচজন নার্সের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তিনজন। নার্স চন্দনা রানী দত্ত বলেন, “অন্তর্বিভাগ থাকলে রোগী ভর্তি, ইনজেকশন দেওয়া—সব কাজ থাকত। এখন শুধু মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য শিক্ষা দিই, প্রেশার মাপি।”
হাসপাতালের পেছনের অংশে দুটি একতলা ও দুটি দোতলা আবাসিক ভবন রয়েছে, যেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জানালার কাচ ভাঙা, ভেতরে জিনিসপত্রও ভাঙা। ভবনের ভেতরে জন্মেছে গাছ। নার্স নুসরাত জাহান বলেন, “কোয়ার্টারগুলো ব্যবহারযোগ্য হলে সেখানে থাকা যেত।”
স্থানীয়দের দাবি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
স্থানীয় শিক্ষক আলী আজগর বলেন, “এলাকাবাসী বিনা মূল্যে জমি দিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ চিকিৎসার অভাবে প্রসূতি নারী রাস্তায় সন্তান প্রসব করে, আহত রোগী পথে মারা যায়। এখন শুধু কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, ডাক্তার রোগী দেখে না—এভাবে হাসপাতাল চলে না।”
গত ৩০ মার্চ ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হাসপাতাল চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, “হাসপাতালটিতে গাড়িতে যেতে ঘণ্টা দেড়েক সময় লেগে যায়। চরাঞ্চলের মানুষের সেবার জন্য হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা খুবই জরুরি। জনবলকাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আছে। অনুমোদন হলে আমরা অন্তর্বিভাগ চালু করতে চাই।” ওষুধ বিতরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক, নিন্দনীয়। এটি একটি অপরাধের মতো ব্যাপার। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।”



