বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মৃতিশক্তি একটু একটু করে কমতে থাকে, এটি খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন বা প্রথম স্কুলের শিক্ষকের নাম কী ছিল—এসব কথা ৫০ বছর বয়সের তুলনায় ৮০ বছর বয়সে মনে করাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই নিয়মের একেবারে বাইরে! ৮০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়স হলেও তাঁদের স্মৃতিশক্তি এমন তীক্ষ্ণ থাকে যে, কয়েক দশক কম বয়সী তরুণদের স্মৃতিও তাঁদের কাছে হার মানে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই অসাধারণ মানুষদের বলা হয় সুপারএজার।
সুপারএজারদের নিয়ে গবেষণা
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট এমিলি রোগালস্কি এই সুপারএজারদের নিয়েই একটি যুগান্তকারী গবেষণা চালাচ্ছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য, এই মানুষগুলোর মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে এত বছর পরও এতটা সতেজ থাকে, তা খুঁজে বের করা। এমিলি ও তাঁর দল ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, সুপারএজারদের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাস সাধারণ মানুষের চেয়ে আকারে বড়। কিন্তু শুধু আকারই কি সব? নাকি এর পেছনে আরও কোনো গভীর রহস্য আছে?
এমিলির ভাষায়, 'সুপারএজার হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর বয়স ৮০-এর কোঠা পেরিয়েছে, কিন্তু তাঁর স্মৃতিশক্তি অন্তত ৫০ বা ৬০ বছর বয়সীদের সমান।' তবে শুধু স্মৃতিশক্তি ভালো হলেই হবে না, তাঁদের মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অন্তত তাঁদের বয়সের গড় মানুষের মতো হতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই এমন কাউকে চেনেন, যাঁর বয়স হয়তো ৯০, কিন্তু কথা বললে মনে হয় তাঁর বয়স বড়জোর ৫০! এঁরাই হলেন সম্ভাব্য সুপারএজার।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি করে, তা হলো স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া। এই ভুলে যাওয়াটাই হলো আলঝেইমার রোগের প্রধান লক্ষণ। এমিলি বলেন, 'আলঝেইমার গবেষণার দুটি দিক আছে। একটি হলো, মস্তিষ্কে কী সমস্যা হচ্ছে তা খুঁজে বের করা এবং তা ঠিক করার চেষ্টা করা। অন্যটি হলো, এমন মানুষদের খুঁজে বের করা, যাঁরা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি না হারিয়ে বরং তা আরও শাণিত করছেন।'
কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায় এই সুপারএজারদের
সুপারএজারদের খুঁজে বের করাটা বেশ মজার। এমিলি ও তাঁর দল বিভিন্ন অবসরপ্রাপ্তদের কমিউনিটিতে গিয়ে সুস্থভাবে বয়স বাড়ার ওপর লেকচার দেন। সেখান থেকেই মূলত এই মানুষগুলোর খোঁজ মেলে। আবার অনেক সময় একজন সুপারএজার আরেকজন সুপারএজারকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করেন। শুরুতে শুধু শিকাগো শহরে এই গবেষণা চললেও, এখন তা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাঁচটি ভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল, বর্ণ ও গোষ্ঠীর সুপারএজারদের ওপর গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে।
কীভাবে বোঝা যায় কেউ সুপারএজার
সুপারএজারদের বাছাই করার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। প্রথমে তাঁদের বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা, জরিপ এবং ক্লিনিক্যাল সাক্ষাৎকার দিতে হয়। এরপর তাঁদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করা হয় এবং জিনগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে রক্ত নেওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো, অনেক সুপারএজারই জানতেন না যে তাঁদের স্মৃতিশক্তি এতটা অসাধারণ! যখন তাঁরা এটা জানতে পারেন, তখন তাঁদের গর্ব আর দেখে কে!
এমিলি জানান, এই মানুষগুলো গবেষণার সঙ্গে সারা জীবনের জন্যই যুক্ত হয়ে যান। প্রতি দুই বছর অন্তর তাঁরা ফলোআপের জন্য আসেন এবং প্রতি ছয় মাস পরপর ফোনে তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয়। এমনকি মৃত্যুর পর গবেষণার জন্য তাঁরা নিজেদের মস্তিষ্ক দান করারও সম্মতি দিয়ে রাখেন।
মৃত্যুর পর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে কী পাওয়া যায়
মৃত্যুর পর সুপারএজারদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দারুণ কিছু তথ্য পেয়েছেন। সাধারণত আলঝেইমার রোগের জন্য দায়ী মনে করা হয় টাউ নামে একধরনের প্রোটিনকে, যা মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে যায়। সুপারএজারদের মস্তিষ্কে এই টাউ প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে।
তবে সবচেয়ে বড় চমকটা অন্য জায়গায়! এমন অনেক সুপারএজার আছেন, যাঁদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের প্রচুর জীবাণু বাসা বেঁধেছে। সাধারণ কোনো মানুষের মস্তিষ্কের এই অবস্থা দেখলে চিকিৎসকেরা বলতেন, তাঁর স্মৃতিশক্তি ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সুপারএজারদের স্মৃতিশক্তির কোনো ক্ষতিই হয়নি! তাঁরা আলঝেইমার জীবাণু বয়ে নিয়েও দিব্যি সুস্থ জীবন যাপন করেছেন।
এর পেছনের রহস্যটা কী? তাহলে কি এঁদের জিনগত কোনো বিশেষত্ব আছে? এমিলির মতে, সুপারএজাররা জেনেটিক্যালি সাধারণ মানুষের চেয়ে খুব একটা আলাদা নন। তাহলে রহস্যটা কোথায়?
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সুপারএজারদের মস্তিষ্কে ভন ইকোনোমো নামে একধরনের বিশেষ নিউরন বা স্নায়ুকোষের ছড়াছড়ি থাকে। মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট অংশে সাধারণ মানুষের তুলনায় সুপারএজারদের নিউরন চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি থাকে! মস্তিষ্কের এই অংশটি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনোযোগ ছাড়া স্মৃতি তৈরি হওয়া অসম্ভব।
জীবনযাপনের স্টাইল: ডায়েট নাকি অন্য কিছু
আপনি হয়তো ভাবছেন, সুপারএজাররা নিশ্চয়ই ঘড়ি ধরে স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং প্রচুর ব্যায়াম করেন। কিন্তু না! এমিলির গবেষণায় দেখা গেছে, সুপারএজারদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কোনো মিল নেই। অনেকেই বলেছেন, তাঁরা ছোটবেলায় প্রচুর বাইরের খাবার খেয়েছেন। ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও কেউ হয়তো হুইলচেয়ারে বসে হালকা হাত-পা স্ট্রেচ করেন, আবার কেউ হয়তো শত শত মাইল সাইকেল চালান।
তাহলে আসল জাদুমন্ত্রটা কী? এমিলি বলেন, 'সুপারএজারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে মিলটি আমরা দেখেছি, তা হলো তাঁরা সামাজিকভাবে প্রচণ্ড সক্রিয়।'
বয়স যখন ১০০ পার হয়ে যায়, তখন সমবয়সী বন্ধু বলতে আর কেউ বেঁচে থাকে না। তাই একাকীত্ব কাটানোর জন্য সুপারএজাররা নিজেদের চেয়ে অনেক কম বয়সী মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। কেউ হয়তো স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে ভলান্টিয়ারিং করেন, আবার কেউ নিজের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটান।
সুপারএজারদের আরেকটি বড় গুণ হলো, তাঁদের মানসিক দৃঢ়তা। এঁদের জীবন যে খুব মসৃণ ছিল, তা নয়। কেউ হয়তো হলোকাস্ট বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পার করে এসেছেন, কেউ হয়তো খুব অল্প বয়সেই নিজের সন্তান হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সব সময়ই বলে এসেছেন, 'জীবন আমাকে যতই কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলুক না কেন, আমি ঠিকই ঘুরে দাঁড়াব।'
সামাজিক মেলামেশা মস্তিষ্কের জন্য এত ভালো কেন
আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় নতুন ও চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে ভালোবাসে। আমরা যেমন ভারোত্তোলন করে মাংসপেশি মজবুত করি, তেমনি মস্তিষ্কের জন্যও এক্সারসাইজ দরকার। অপরিচিত বা নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা আড্ডা দেওয়াটা মস্তিষ্কের জন্য দারুণ এক্সারসাইজ।
এমিলির একজন সুপারএজারের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি নিজের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তাদের যুগে ঢুকে গিয়েছিলেন। তিনি এমিলিকে বলেছিলেন, 'ওরা তো আর ফ্রাঙ্ক সিনাত্রাকে চেনে না, তাই ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাকে জানতে হয় টেইলর সুইফট বা চান্স দ্য র্যাপার শহরে কনসার্ট করতে আসছে কি না!' এই প্রজন্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই তাঁদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে।
আমাদের জন্য কী পরামর্শ
আমরা অনেক সময়ই ভাবি, আমাদের জিন ভালো না হলে হয়তো আমরা বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে পারব না। কিন্তু এমিলির মতে, জিনই সব নয়। আমাদের জীবনযাপনের স্টাইল একে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
আপনি যদি বৃদ্ধ বয়সেও সুপারএজারদের মতো তরতাজা মগজ পেতে চান, তবে এমিলির এই ছোট্ট পরামর্শটি মনে রাখতে পারেন: 'আপনি হয়তো অফিস থেকে একা হেঁটে ফিরছেন। আপনার মনে হলো, কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনবেন নাকি কোনো পুরোনো বন্ধুকে ফোন করবেন? আমি বলব, বন্ধুকেই ফোন করুন!'
হ্যাঁ, সামাজিক যোগাযোগ এবং হাসি-আড্ডাই হতে পারে আপনার মস্তিষ্কের আসল তারুণ্যের চাবিকাঠি!
সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট



