ওজন না কমার পেছনে লিভারের গোপন রোগ ফ্যাটি লিভার
ওজন না কমার পেছনে লিভারের গোপন রোগ ফ্যাটি লিভার

ওজন না কমার পেছনে লুকিয়ে আছে লিভারের গোপন রোগ

বর্তমানে ওজন বৃদ্ধি ও মেটাবলিজম ধীর হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ফ্যাটি লিভার। চিকিৎসকরা বলছেন, ফ্যাটি লিভারের কারণে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়, যা পরোক্ষভাবে শরীরের মেটাবলিজমের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে অপ্রত্যাশিত ওজন বৃদ্ধি দেখা দেয়। ভুক্তভোগীরা ডায়েটে বড় পরিবর্তন আনলেও অনেক সময় ওজনে কোনো হেরফের হয় না। এর মূল কারণ, লিভারে চর্বি জমলে শরীর ইনসুলিন প্রতিরোধী হয়ে পড়ে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করায় এবং অগ্ন্যাশয়সহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

ফ্যাটি লিভার কী?

লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। লাইফস্টাইল, খাদ্যাভ্যাস এবং বংশগত কারণে হওয়া এই সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি)। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া, অলস জীবনযাপন এবং স্থূলতার কারণে এই রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গ্রেড-১ বা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব।

ফ্যাটি লিভার ও ওজন বৃদ্ধির গোপন সংযোগ

বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লিভারে চর্বি জমলে তা শরীরের চর্বি পোড়ানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। লিভার মূলত আমাদের শরীরের চর্বি ও গ্লুকোজের ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু যখন লিভার নিজেই চর্বিতে ঢাকা পড়ে যায়, তখন এই পুরো ভারসাম্যটাই নষ্ট হয়ে যায়। তাই চিকিৎসকদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আগে লিভারের যত্ন নেওয়া এবং চর্বি কমানো জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যেভাবে মেটাবলিজম ধীর করে দেয় ফ্যাটি লিভার

  1. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: ফ্যাটি লিভার হলে শরীর চর্বি পোড়ানোর বদলে তা জমা করে রাখতে শুরু করে। শক্তির প্রয়োজনে শরীরের যেখানে চর্বি গলানোর কথা, সেখানে লিভারের কোষে ফ্যাট জমে থাকায় তা বাধাগ্রস্ত হয়।
  2. চর্বি জারণ বা ফ্যাট অক্সিডেশন কমে যাওয়া: লিভারের কোষে চর্বি জমে যাওয়ার ফলে ক্যালোরি পোড়ানোর প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে শরীর সহজে জমে থাকা মেদ ঝরাতে পারে না।
  3. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: লিভারের সমস্যা ক্ষুধার হরমোনগুলোকে ওলটপালট করে দেয়। এর ফলে কখন ক্ষুধা লাগছে আর কখন পেট ভরছে, সেই সংকেত শরীর ঠিকমতো পায় না, যা মেটাবলিজমকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লক্ষণগুলো কী কী?

  • ডায়েট বা ব্যায়াম করার পরও পেটের জেদি চর্বি বা ভুঁড়ি কিছুতেই না কমা।
  • পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং বিশ্রামের পরও সারাক্ষণ ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করা।
  • রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের (এক ধরনের চর্বি) মাত্রা বেড়ে যাওয়া, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • কঠোর চেষ্টা সত্ত্বেও ওজন কমার গতি অত্যন্ত ধীর হওয়া।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
  • প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস
  • শারীরিক পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাপন
  • অতিরিক্ত মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস

প্রাকৃতিক উপায়ে ফ্যাটি লিভার নিরাময় ও মেটাবলিজম বাড়ানোর উপায়

লিভার বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যা ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে অনেক কঠিন করে তোলে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে লাইফস্টাইলে কিছু পরিবর্তন এনে এটি দূর করা সম্ভব:

  • খাদ্যাভ্যাসে বদল: রিফাইন করা কার্বোহাইড্রেট (যেমন সাদা চাল, ময়দা) এবং চিনি খাওয়া একেবারেই কমিয়ে দিতে হবে। এর বদলে খাবারে ফাইবার (আঁশযুক্ত খাবার) এবং প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
  • খাবারের সময়সূচি: শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’-এর সঙ্গে মিলিয়ে রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খাওয়ার অভ্যাস মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।
  • ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত কয়েকদিন কার্ডিও (যেমন হাঁটা বা দৌড়ানো) এবং ওয়েট ট্রেনিংয়ের (পেশি মজবুত করার ব্যায়াম) একটি সমন্বিত অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
  • ওজন হ্রাস: শরীরের সামগ্রিক ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেই লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
  • লিভার সুরক্ষায় উপকারী কিছু খাবার: চিকিৎসকদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ব্ল্যাক কফি লিভার সুরক্ষায় দারুণ কার্যকর। এ ছাড়া সবুজ শাকসবজি, বাদাম, বীজ এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন সামুদ্রিক মাছ) লিভারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করে।

ওজন কমানোর মিশন সফল করতে চাইলে আগে লিভারের ভেতরের এই গোপন সমস্যার সমাধান করা জরুরি। লিভার সুস্থ হলে মেটাবলিজম নিজে থেকেই গতি ফিরে পাবে।

সূত্র: এনডিটিভি