হামের প্রাদুর্ভাব: টিকা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার গল্প ও জবাবদিহির দাবি
হামের প্রাদুর্ভাব: টিকা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার গল্প ও জবাবদিহি

বাংলাদেশে বর্তমান হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে: একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ কীভাবে ফিরে আসার সুযোগ পেলো? গত জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রথম হামের সংক্রমণ দেখা দেয়। মে মাসের শুরুর দিকে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মূলত শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষ হাম বা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, শয্যা সংকটে রোগীরা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ হাম-রুবেলার (এমআর) একটি ডোজও পাননি।

টিকা ব্যবস্থার সাফল্য ও পতন

যদি টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবে কাজ করে তবে অবশ্যই হাম অত্যন্ত সহজে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশ এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা বজায় রেখেছিল। নিয়মিত টিকাদান, সম্পূরক ক্যাম্পেইন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হতো। এই প্রক্রিয়াটিটি সাধারণ মনে হলেও এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় এনে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

এই সাফল্য কোনও কাকতালীয় বিষয় ছিল না। ৯ ও ১৫ মাস বয়সে দুটি এমআর ডোজ প্রদান এবং প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতো। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ এবং গ্যাভি ও সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই ব্যবস্থাটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা স্থগিত করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফের তৎকালীন কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রানা ফ্লাওয়ার্স এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে সতর্ক করেন যে, এর ফলে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হতে পারে এবং প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়বে। রানা ফ্লাওয়ার্স পরবর্তীকালে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীকে জানান যে, তিনি স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে জরুরি ভিত্তিতে এই ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন। তবে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এ বিষয়ে গণমাধ্যমের কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি।

এরপর শুরু হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, যার পরিণতি এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট। অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন ক্রয় মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অডিটর জেনারেল আগের বছরের অমীমাংসিত হিসাবের বিষয়টি সামনে আনেন। শেষ পর্যন্ত সরকার পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্তে ফিরে আসলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। টিকার মজুত শেষ হয়ে যায় এবং স্থগিত হওয়া সম্পূরক এমআর ক্যাম্পেইনটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের এক সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছিল— যদিও পরে সেই তথ্যটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

পুরো ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট যে একটি কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ভেঙে পড়েছিল। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। যার ফলে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে এবং শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। এই ক্ষতির পেছনে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা হয়তো নিরপেক্ষ তদন্তের পরই বোঝা যাবে। পরবর্তী সময়ে মৃত্যুগুলোকে ‘মানবিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করে সমবেদনা জানানো হয়েছে বটে। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের দায়বদ্ধতা কেবল সমবেদনার ভাষা দিয়ে বিচার করা হয় না, বরং এটি বিচার করা হয় দূরদর্শিতা দিয়ে। অর্থাৎ কখন কী জানা ছিল এবং সেই অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ৯৫ শতাংশ টিকাদানের প্রয়োজনীয়তা কোনও অস্পষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্য নয়, এটি হাম নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক শর্ত। মাঝপথে ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তনের পরিণতি কী হতে পারে, তা আগেই স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। এটি এমন কোনও ব্যর্থতা নয়— যা বোঝার জন্য ঘটনার শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এটি রিয়েল টাইম বা তাৎক্ষণিকভাবেই দৃশ্যমান ছিল।

গত ২৮ এপ্রিল মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) টিকাদানে ‘অবহেলা বা সিদ্ধান্তহীনতার’ জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। তাদের এই প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত যৌক্তিক। দায়বদ্ধতা কেবল সমবেদনা জানিয়ে শেষ হয় না। যারা আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা করে একটি সচল টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দায়ীদের নাম প্রকাশ্যে আসতে হবে। কেন তারা অভিজ্ঞ সংস্থাকে উপেক্ষা করে নিজেদের সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা তাদেরকে দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কোনও ফৌজদারি তদন্তের প্রয়োজন হলে এই তথ্যগুলো সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আন্তর্জাতিক নজির ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশই প্রথম এমন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে না। ব্রাজিলের সিনেট তদন্তে মহামারি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফিলিপাইনেও টিকা সংক্রান্ত ঘটনায় সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সাজা হওয়ার নজির কম হলেও, প্রকাশ্য তদন্ত পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করার ঘটনা একেবারেই নতুন নয়।

বাংলাদেশের এমন তদন্ত করার সক্ষমতা রয়েছে। সাবেক বিচারপতি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যার রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন— যা ভবিষ্যতে সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত প্রতিরোধের মাপকাঠি হিসেবে কাজ করবে। তা না হলে নীতি নির্ধারকরা মনে করবেন যে, ভুল সিদ্ধান্তের ফলে সংগঠিত প্রাণহানির দায় সহজেই এড়ানো সম্ভব। এই ধরনের চিন্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের জনস্বাস্থ্য বারবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

এপ্রিল থেকে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয়। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে এবং ৬০৪ কোটি টাকা জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচিতে ১ মে পর্যন্ত ১১ মিলিয়ন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দায়বদ্ধতার বিকল্প নয়। যে শিশুরা মারা গেছে, তারা হাম নিরাময়যোগ্য নয় বলে মরেনি, বরং সতর্কবার্তা সত্ত্বেও একটি কার্যকর ব্যবস্থা ধ্বংস করার ফলে তারা আজ নেই— তাদের পরিবার কেবল সমবেদনা নয়, একটি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা পাওয়ার দাবিদার।

যদি এই ভুল সিদ্ধান্তের মূল কারণ এবং দোষী ব্যক্তিদের স্বরূপ উন্মোচন না করা হয়; তাহলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল সম্পদের অভাবে ব্যর্থ হয় না, এটি তখনই ভেঙে পড়ে, যখন নিশ্চিত ঝুঁকিগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়।

এ মুহূর্তে শুধু পরিস্থিতি মোকাবিলা নয়, প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত; কী জানা ছিল, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার পেছনের যুক্তি কী ছিল এবং কারা তা নিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না থাকলে এই প্রাদুর্ভাব একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে। কিন্তু যথাযথভাবে তা তদন্ত হলে, এই ঘটনাই হতে পারে, ভবিষ্যৎ নীতিগত সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের সূচনা।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য