হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু, সংক্রমণ কমতে দেড়-দুই মাস সময় লাগবে
হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু, সংক্রমণ কমতে দেড়-দুই মাস

দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪০৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে আরও দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। তারা জানান, সারা বিশ্বেই হাম বেড়েছে, তবে বাংলাদেশের মতো এত শিশুর মৃত্যু আর কোথাও হয়নি। এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা শিশুকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিড না করানো, সময়মতো টিকা না দেওয়া, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন না হওয়া, পুষ্টিহীনতা এবং শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে দায়ী করেন।

সংক্রমণ চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হামে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬৫ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৪৪ জনের। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১১ শিশুর। মৃত্যু হওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ৪ শিশুর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে এবং বাকি ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো হাম সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১,৫০৩ জন। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২০৫ শিশুর শরীরে। অর্থাৎ, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১,৭০৮ শিশু। নিশ্চিত হামে ঢাকায় ৩ শিশু ও বরিশালে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় ৩, চট্টগ্রামে ২ ও সিলেটে ২ শিশু মারা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৯,১৫৯ শিশুর মধ্যে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪,৯০৯ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে ৩০,৮৬২ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৬,৮১৯ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারির কারণে টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার ফলে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের 'হার্ড ইমিউনিটি' সীমার নিচে নেমে গেলে সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন 'এ' নিশ্চিত করা জরুরি।

মির্জা জিয়াউল আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। পাশাপাশি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর প্রধান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। তবে মুশকিল হলো, পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাব।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সারা দেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

টিকাদান কর্মসূচি

এদিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ জন শিশু হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করেছে। সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৬ শতাংশ পূরণ হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-রুবেলা টিকাদান সমন্বয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভাগভিত্তিক টিকা গ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা হিসেবে বরিশালে ১০ লাখ ৮ হাজার ৩০১ জন, চট্টগ্রামে ৩৯ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭২ জন, ঢাকায় ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ৮৭০ জন, খুলনায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৪৬ জন, ময়মনসিংহে ১২ লাখ ৯৪ হাজার ১৫ জন, রাজশাহীতে ২০ লাখ ২০ হাজার ৩৭৩ জন, রংপুরে ১৮ লাখ ৬২ হাজার ১৯৬ জন এবং সিলেটে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৫ জন টিকা গ্রহণ করেছে।