হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু: আইসিইউ সংকট ও জরুরি চিকিৎসার অভাব
দেশব্যাপী সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব চলছে, যেখানে সময়মতো জরুরি চিকিৎসা কিংবা আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সাপোর্ট না পাওয়ার কারণে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। চাহিদার তুলনায় সারা দেশে জরুরি আইসিইউ চিকিৎসাসেবা খুবই সীমিত, যা হামে মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।
হামের আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হামের উপসর্গে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮০৫ জন, আর হাম উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ৯৩৫ জন। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭ হাজার ৮৫ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১৪ হাজার ১০৬ জন।
আইসিইউ সংকটের পেছনের কারণ
বিগত সরকারের আমলে করোনা ও ডেঙ্গুর সংক্রমণের সময় জেলা সদর হাসপাতালে ৮-১০ বেডের আইসিইউ এবং উপজেলা হাসপাতালে ৩-৪ বেডের আইসিইউ কর্নার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সিংহভাগ জেলাসদর ও উপজেলা হাসপাতালে আইসিইউ কর্নার চালু হয়নি। মাত্র গুটিকয়েক জেলা-উপজেলা হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাসেবা ও আইসিইউ চালু করা হয়েছিল, কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ হওয়ার পর সেসবের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর প্রভাব পড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে গিয়ে, যেখানে অব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা ও আইসিইউ ব্যবস্থাপনা সংকটে হামে মৃত্যুর হার বাড়ছে।
চিকিৎসকদের অভিমত ও ক্ষোভ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, ৯ মাসে ও ১৫ মাসে দুই ডোজ টিকা সময়মতো নিতে না পারা হামে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। সময়মতো জরুরি চিকিৎসা ও আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়ার কারণে হামে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বাড়ছে বলে অভিমত তাদের। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, রোগের প্রাদুর্ভাব কমে গেলে কিংবা নিয়ন্ত্রণে এলে জরুরি চিকিৎসাসেবা কিংবা আইসিইউ সংকটের কথা আমরা ভুলে যাই কিংবা উদ্যোগ নিলেও কার্যক্রম ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
হাসপাতালগুলোর হিমশিম অবস্থা
হামের প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে আইসিইউর জন্য নাম তালিকাভুক্ত করে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে, যেখানে বেশির ভাগ শিশুই সময়মতো আইসিইউ পাচ্ছে না। সম্প্রতি রাজশাহীতে মৃত্যুর পরদিন এক শিশুর আইসিইউর সিরিয়াল পাওয়ার ঘটনা বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঢাকার বাইরে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের চাহিদার তুলনায় আইসিইউ ব্যবস্থা খুবই সীমিত, ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হামে আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগ ঢাকায় চলে আসছে।
হাসপাতালগুলোর তালিকা ও সংকট
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতাল হামে আক্রান্ত রোগীর ভিড় সামাল দিতে গিয়ে হিমমিশ খাচ্ছে। সংকটাপন্ন রোগীকে সময়মতো আইসিইউ দেওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে শিশু হাসপাতালে মাত্র ১৪টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে, ফলে সেখানে অনেক রোগীই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘চোখের সামনে আইসিইউ সাপোর্ট সময়মতো না পেয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। এই মৃত্যু কোনভাবে মেনে নিতে পারছি না।’
জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকট
আইসিইউ তো দূরের কথা, অনেক জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (হাসপাতাল) চিকিৎসক, টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য জনবল এবং যন্ত্রপাতি সংকট রয়েছে, যা বহু বছর ধরে চলে আসছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, জেলার সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকরা জনবল নিয়োগ এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বহু চিঠিপত্র চালাচালি করেছেন, কিন্তু কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল মিলে দুই সহস্রাধিক চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান।
অপারেশন বন্ধের সমস্যা
কোন কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অজ্ঞানকারী চিকিৎসক (অ্যানেসথেসিওলজিষ্ট) না থাকায় অপারেশন বন্ধ, আবার কোন কোন উপজেলায় অজ্ঞানকারী চিকিৎসক রয়েছেন কিন্তু সার্জন নেই, সেখানেও অপারেশন বন্ধ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার রয়েছে, সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনসহ অন্যান্য জেনারেল অপারেশন করা সম্ভব, কিন্তু আইসিইউ না থাকায় হাম জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে অধিকাংশ রোগী ঢাকায় চলে আসছে।
বেসরকারি হাসপাতালের অবস্থা
অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ চিকিৎসার নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য, যেখানে মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের পক্ষেও এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ জোগান সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের হামে আক্রান্ত শিশুদের একমাত্র ভরসার জায়গা সরকারি হাসপাতাল, যা সংকটে পড়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও আশা
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জেলা সদর হাসপাতাল আইসিইউ ব্যবস্থা চালু করার কার্যক্রম শুরু করেছি। যেসব জেলায় হামসহ সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেইসব জেলায় আইসিইউ আগে চালু করা হবে।’ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিষ্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার এন্ড পেইন মেডিসিন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ডা. কামাল আহমেদ বলেন, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ও জরুরি কর্নার চালু, জনবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ করাসহ একটি প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা হলে আইসিইউ সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ইত্তেফাককে বলেন, ‘জেলাসদর ও উপজেলা হাসপাতালে আইসিইউসহ তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বাজেটে এজন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হবে।’ এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



