সম্পাদকীয়: টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ থেমে নেই। মার্চ মাসে দেশে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ পেরিয়েছে, যার ৮০ শতাংশের বয়সই পাঁচ বছরের নিচে। এ তথ্যই বলে দেয়, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় মনোযোগ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘাটতি কতটা গভীর।
টিকার সাফল্যের ইতিহাস
গত কয়েক দশকে টিকাদানের সাফল্যের কারণে হামের মতো সংক্রামক ব্যাধিতে শিশুমৃত্যু প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকার সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে বাংলাদেশ এখন হামের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
টিকাদান কর্মসূচি ও বাস্তবতা
মার্চ মাসে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সরকার দ্রুততার সঙ্গে হাম–রুবেলা টিকা সংগ্রহ করে। গত ৫ এপ্রিল হামের ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া। তবে টিকা দেওয়া হয়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ যে ৩০ উপজেলায় প্রথম ধাপে টিকাদান শুরু হয়েছিল, তার ৫টির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ৮ সপ্তাহ পর এসেও সংক্রমণ থামেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে, হামের সংক্রমণ কমে এসেছে, আগামী ২০–২৫ দিনে আরও কমে আসবে। তবে এ বক্তব্যে আশাবাদের জায়গাটা কতটা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা জনস্বাস্থ্যবিদেরা দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁরা সতর্ক করে দিয়েছেন, হামের টিকার কাভারেজ দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ না হলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে না, তাতে সমস্যা দীর্ঘায়িত হবে।
ব্যবস্থাপনার ঘাটতি
আমরা মনে করি, হামের প্রাদুর্ভাবকে এককভাবে টিকা সংগ্রহ ও প্রদানের সংকট হিসেবে দেখার কারণে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। সে কারণে সবখানে টিকার ৯৫ শতাংশ কাভারেজ হয়েছে কি না, টিকা দেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই অনুপস্থিত। প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রথম দিকেই প্রবণতা দেখে জনস্বাস্থ্যবিদেরা স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণাসহ অন্য যেসব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বাস্তবে সেগুলোতে কর্ণপাত করা হয়নি; বরং সমস্যা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিতেই এগিয়েছে সরকার।
মানবিক বিপর্যয়
হামে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরা আর আইসিইউর সিরিয়াল পেতে পেতে মৃত্যুর খবর এখন নিত্যদিনের শিরোনামে পরিণত হয়েছে। অপেক্ষাকৃত গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সব মিলিয়ে হাম দেশে একটা মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
সাবেক পরিচালকের প্রশ্ন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ হাম ব্যবস্থাপনা নিয়ে যথার্থ প্রশ্নই তুলেছেন। সংক্রমণ ও মৃত্যু বিবেচনায় হামের ক্ষেত্রে যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, শুরু থেকেই সেখানে বড়সড় ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে। হামের সংক্রমণ কবে কমবে, আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঠিকমতো চিকিৎসা পাবে কি না, তা নিয়ে নাগরিকেরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন। প্রাদুর্ভাবের তিন মাস পর এসেও এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই জন–উদ্বেগ নিরসনে সরকারকে অবশ্যই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।



