ঈদের পর ডেঙ্গু আতঙ্ক: বৃষ্টিতে বাড়ছে এডিস মশার প্রজননস্থল
ঈদের পর ডেঙ্গু আতঙ্ক: বৃষ্টিতে বাড়ছে এডিস মশার প্রজনন

ঈদুল আজহার ছুটির পর ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশেষজ্ঞরা জানান, খোলা জায়গা, মাঠ, অফিস এলাকা, স্কুল-কলেজ ক্যাম্পাস, বাড়ির আঙিনা, পার্কিং বেসমেন্ট ও ফুলের টবে জমে থাকা পানি মশার প্রজনন ত্বরান্বিত করতে পারে। তারা পরিস্থিতি আরও অবনতি রোধে তাৎক্ষণিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর জোর দেন।

ডিজিএইচএসের তথ্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে বরিশাল বিভাগে (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ১১ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৬ জন রোগী ভর্তি হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৬ জনের ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৭৩ জনে পৌঁছেছে। ডিজিএইচএসের তথ্যে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ ও মে মাসে ৭১৪টি কেস রেকর্ড করা হয়েছে। জুনের প্রথম পাঁচ দিনেই ৩৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান

এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২, মার্চে ১, মে ও জুনে ১ জন করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কী বলছেন কীটতত্ত্ববিদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ঈদের পর ডেঙ্গু রোগী উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে এবং আগের সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। তবে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, শুধু সিটি কর্পোরেশনের প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতাও বাড়াতে হবে। ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফিরে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ড্রেন, পাত্র ও ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক বাশার আরও সতর্ক করে বলেন, নির্মাণাধীন ভবন, বেসমেন্ট, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও নিচু এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে মশার প্রজননস্থল হতে পারে। তিনি পানি জমে থাকা এলাকায় লার্ভিসাইড ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে জীবাণুনাশক ও ফগিং কার্যক্রম চালানোর ওপর জোর দেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতামত

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, বর্ষা মৌসুমে অফিস, বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পানি জমে, যা এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়তে পারে, তবে প্রাথমিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা কমানো সম্ভব।

তিনি বাড়ির ফুলের টব, ড্রেন, গর্ত ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং স্কুল-কলেজ খোলার আগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দেন। ডা. বারী আরও বলেন, শুধু কীটনাশক স্প্রে করেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, সচেতনতা ও স্যানিটেশন ক্যাম্পেইনে সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তিনি ওয়ার্ডভিত্তিক ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর জোর দেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ ওয়ার্ড অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে এডিস মশার ঘনত্ব গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গত ৪ জুন নগর ভবনে ‘প্রি-মৌসুম এডিস মশার লার্ভা জরিপ ফল প্রকাশ ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান ডিএসসিসির প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল সালাম। জরিপে ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়।

অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো: ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২, ৪, ৫, ৬, ৯, ১১, ১৩, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৭ ও ৫২। ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, ৭ জুন থেকে এই ২৭টি ওয়ার্ডে পাঁচ দিনের ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হবে, যা স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে। পরে ৩৬টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।