ঈদুল আজহার ছুটিতে রাজধানীতে ১৫ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। ২৫ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর মৃতদের মরদেহ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
দারুসসালামে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু
দারুসসালাম থানা পুলিশ জানায়, ঈদুল আজহার আগের দিন বুধবার দুপুরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পুলিশ হরিরামপুর এলাকার টিনের ছাপড়া ঘরের মেঝে থেকে নূর মোহাম্মদ ওরফে হৃদয় (২৫) এবং তার স্ত্রী ঝুমা আক্তারের (১৮) মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তাদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। নূর মোহাম্মদের সঙ্গে স্ত্রী ঝুমা আক্তারের দু-তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। ঝুমা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন জানান, ঝুমার মাসহ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, বাসার ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল। প্রতিবেশীদের সন্দেহ হলে তারা ঝুমার স্বজনদের খবর দেন। পরে স্বজনেরা দরজা ভেঙে ঘরের বাঁশের আড়ার সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় থাকা নূর মোহাম্মদ ও ঝুমার মরদেহ নামিয়ে আনেন। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে ঘটনাটি আত্মহত্যা হতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
যাত্রাবাড়ীতে গৃহিণীর আত্মহত্যা
যাত্রাবাড়ী মাতুয়াইল ঠাকুরবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে শ্রাবণী আক্তার পলি (২৮) নামে এক গৃহিণীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হোসেন উল্লেখ করেন, স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে ২৭ মে বিকালে গলায় ফাঁস দেন তিনি।
বাড্ডায় চাকুরিজীবীর মৃত্যু
২৬ মে রাতে রাজধানীর দক্ষিণ বাড্ডার দারোগাবাড়ি এলাকার একটি বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে উদ্ধার করা হয় মামুনুর রশিদ (৩৫) নামে এক চাকুরিজীবীর ঝুলন্ত মরদেহ। পারিবারিক কলহের কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন ভাটারা থানার এসআই আবু ইউসুফ।
রামপুরায় বেকার যুবকের আত্মহত্যা
রামপুরা থানার উপ-পরিদর্শক সুব্রত পাল জানান, পূর্ব রামপুরার অগ্নিশিখা গলির একটি বাসা থেকে ২৮ মে রাতে উদ্ধার করা হয় আব্দুল্লাহ (২৪) নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ। আর্থিক সংকট ও বেকারত্বের কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে।
ভাটারায় গৃহিণী হত্যা
ভাটারার ছোলমাইদ ব্যাপারীবাড়ি এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২৯ মে উদ্ধার করা হয় পূর্ণিমা আক্তার (২৫) নামে এক গৃহিণীর মরদেহ। স্বামীর সঙ্গে সাংসারিক বিরোধ ছিল তার। এর জের ধরে স্বামী তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে শিশু সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে যায় বলে জানান এসআই মো. ইয়াউর রহমান।
ভাটারায় রাইডারের আত্মহত্যা
একই দিন ভাটারা শোলমাইল দর্জিবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মনির গাজী (২৪) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করার কথা জানিয়ে ভাটারা থানার এসআই জাহিদুল ইসলাম বলেন, “মনির ফুটপাণ্ডার রাইডার হিসেবে চাকরি করতেন।”
তিনি বলেন, “৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পুলিশ ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার একটি বাড়ির তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেঙে মনিরের মরদেহ উদ্ধার করে। তার মরদেহ লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় ছিল। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।”
এসআই জাহিদুল জানান, বাড়ির মালিক মনির গাজীর বাসায় কোরবানির মাংস দিতে গেলে ভেতর থেকে দরজা লাগানো দেখতে পান। তিনি কোনও সাড়াশব্দ পাননি এবং ওই কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মনির গাজী গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তার বাড়ি বরগুনার আমতলী হরিদ্রা বাড়িয়ায়। তার বাবা মৃত আনোয়ার গাজী।
কামরাঙ্গীরচরে রিকশাচালকের মৃত্যু
২৯ মে রাতে ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পুলিশ রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ এলাকার একটি বাসার দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফিতা প্যাঁচানো অবস্থায় রিকশাচালক মো. এনাজুল ওরফে সুমনের (২৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠায় পুলিশ। তার বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানার হিংসা বাগবাড়িতে বলে জানিয়েছেন কামরাঙ্গীরচর থানার এসআই ব্রজ কিশোর পাল।
ডেমরায় শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু
ডেমরার মেন্দিপুর আমান মার্কেট এলাকার নিজ বাড়ির পাশে ২৮ মে দুপুরে আবাদি জমির পানিতে পড়ে যায় অয়ন্তী নামে দুই বছরে এক শিশু। পরিবার দেখতে পেয়ে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পান্থপথে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
পান্থপথে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের সাততলা থেকে ২৭ মে বিকালে লাফিয়ে পড়ে মারা যান মো. সৌরভ (২৭) নামের একজন শিক্ষার্থী। তিনি রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতেন।
তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হচ্ছে। তার বাবা জানিয়েছেন সৌরভ হতাশাগ্রস্ত ছিলেন।
শাহবাগে ভবঘুরের মৃত্যু
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে ফুটপাত থেকে ২৮ মে সকালে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতনামা এক ভবঘুরের ব্যক্তির (৫০) মরদেহ বলে জানিয়েছেন শাহবাগ থানার এসআই রাসেল পারভেজ।
ডেমরায় কিশোরের আত্মহত্যা
ডেমরার ডগাইর পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে শাকিল হোসেন (১৬) নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করেছে ডেমরা থানা পুলিশ। থানার এসআই আহসান হাবিব জানান, শাকিল একটি প্যাকেজিং কারখানায় চাকরি করতো। একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তার। এটি নিয়ে পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে শাকিল।
আজিমপুরে কিশোরের ডুবে মৃত্যু
গত ২৫ মে রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি পুকুরে ডুবে মুহতাসিম হক জাহিন (১৫) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। সে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উদ্ধারকারী আবদুল কুদ্দুস জানান, বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে নামার পর এক কিশোর তলিয়ে যায়। পরে তিনি পুকুরে নেমে কয়েক মিনিট খোঁজাখুঁজির পর জাহিনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। এরপর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জুরাইনে বই ব্যবসায়ীর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু
২৬ মে পুরান ঢাকার জুরাইনে শ্যালকের বাসায় কোরবানির পশু পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন বই ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। সেখান থেকে হেঁটে ফেরার পথে জুরাইনের ঋষিপাড়া সড়কের পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। সেখানে পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ে ছিল। অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে আনোয়ারকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে বেলা পৌনে ২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আনোয়ার হোসেন সপরিবার যাত্রাবাড়ীতে বইয়ের ব্যবসা করতেন এবং একই এলাকার শহীদ ফারুক সরণির একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন।
তেজগাঁওয়ে যুবকের মৃত্যু
ঈদুল আজহার দিন ২৮ মে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার কাছে এক যুবক (৩৫) অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন শুক্রবার (২৯ মে) বিকালে মারা যান তিনি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান।



