রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে অভিভাবকদের মাঝে শোক বিরাজ করছে। দুই থেকে তিনদিন বয়সী নবজাতক হারিয়ে আহাজারি করছেন বাবা-মা ও স্বজনরা। এরপর বিভ্রান্তি ও অভিযোগে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালটির পোস্ট অপারেটিভ ফ্লোর।
নবজাতকদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে অভিযোগ
নবজাতকদের মৃত্যুর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিলেও স্বজনদের অভিযোগ, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকার কারণেই নবজাতকদের মৃত্যু হয়েছে। মাত্র কিছু সময়ের মধ্যেই মায়েদের দীর্ঘ দিনের কষ্ট ও স্বজনদের অপেক্ষার পরে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের পেয়ে আনন্দ এখন বিষাদে রূপ নিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
বুধবার (২৭) দুপুরে হাসপাতালটির পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা আহাজারি করছেন। কারও কোলে সদ্যোজাত শিশুর নিথর দেহ। পাশে বসে আছেন সদ্য সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া মা। যিনি নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না, অথচ সন্তানের মৃত্যু মেনে নেওয়ার যুদ্ধ করছেন।
নবজাতক ওয়ার্ডের সামনে ৩ দিন বয়সী নাতির মরদেহ কাপড়ে পেঁচিয়ে কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় দাদি নাসিমা বেগমকে। তারা এসেছিলেন মুন্সিগঞ্জ থেকে। ছেলে আকাইদ হোসেন আরিফ ও মিম দম্পতির প্রথম সন্তান ছিল। নাসিমা বলেন, ‘আমার নাতির কোনো সমস্যা ছিল না। আজ রাতে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। আমরা ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলাম, সেখানে ১০ থেকে ১৩টি বাচ্চা ভর্তি ছিল। হঠাৎ রাত ৩টার দিকে সব বাচ্চা কান্না শুরু করে। কিন্তু কী কারণে কান্না করছে আমরা বুঝতে পারছিলাম না। তখন আমরা কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এরপর সকালে একে একে সব বাচ্চা মারা যায়।’
দোহার থেকে ছেলের বউকে নিয়ে হাসপাতালে আসা জানু বেগম মৃত নাতিকে কোলে নিয়ে আহাজারি করতে করতে হাসপাতাল ছাড়ছিলেন। জানু বেগমের স্বজনরা জানান, ৩ দিন বয়সী এই নবজাতকও সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। একইভাবে কান্না করতে করতে সেও মারা গেল।
অন্যান্য রোগীর স্বজনদের ক্ষোভ
এদিকে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ চিকিৎসা নিতে আসা অন্য রোগীর স্বজনরা। তারা বলছেন, আদ-দ্বীন হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি করানোর সুনাম রয়েছে। তারা এই সুনামকে এখন অপব্যবহার করছে। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে ক্লিনার কারোরই ব্যবহার ভালো না।
কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা নাদিম বলেন, গতরাত থেকেই কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। নার্সরা রাতে বলেছিল, এসিতে সমস্যা। সকালে দেখি একে একে শিশুদের বের করে আনা হচ্ছে। কেউ বমি করছে, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সকালেই আমার ভাইয়ের ছেলে মারা যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ড. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, যে ওয়ার্ডে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে ১১ জন মা ছিলেন, আর নবজাতক ছিল ছয়জন। এটি আমাদের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড। এখানে ডেলিভারির পর মা-বাচ্চার সঙ্গে একজন করে থাকেন। বাচ্চারাও মায়ের পাশেই ছিল।
তিনি বলেন, যেহেতু এটি এসি ওয়ার্ড, রাতে মায়েরা ঠান্ডা লাগার কথা বলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন। রাত ৩টার দিকে দুই শিশু অসুস্থ হলে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা দেখে তাদের ভালো আছে বলে আবার ওয়ার্ডে পাঠাতে বলেন। পরে সকাল ৬টার দিকে মায়েরা জানান, শিশুদের অসুস্থ মনে হচ্ছে। তখন ছয় শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। দুই শিশু এনআইসিইউতে নেওয়ার পথেই মারা যায়। বাকি চার শিশুর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো যায়নি।



