২২ বছর শিকলবন্দী মানসিক রোগী, চিকিৎসা না পেয়ে দুর্বিষহ জীবন
২২ বছর শিকলবন্দী মানসিক রোগী আবুল খায়ের

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের একটি ভাঙাচোরা টিনের ঘরের অন্ধকার কোণে ২২ বছর ধরে কোমরে শিকল বাঁধা অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক আবুল খায়ের। অভাবের কারণে তার চিকিৎসা সম্ভব হয়নি, ফলে তার জীবন অনিশ্চিত গন্তব্যে চলছে বলে জানিয়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

শুরুর ঘটনা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল আবুল খায়েরের। বিয়ের তিন বছর পর থেকেই তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে আশপাশের লোকজনকে মারধর ও বিরক্ত করতে শুরু করেন। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন বাবা নুর মিয়া। এর পর থেকেই তার শিকলবন্দী জীবন শুরু হয়।

পরিবার ও বর্তমান অবস্থা

স্বজনদের ভাষ্য, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর আবুল খায়েরের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। সন্তান না থাকায় স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। আপন ভাইবোন না থাকায় বর্তমানে তার দেখাশোনা করছেন চাচাতো ভাই আবদুর রহমান, যিনি পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। বাবার রেখে যাওয়া আধা শতাংশ জায়গায় ছোট্ট টিনের ঘরটিই এখন খায়েরের পুরো পৃথিবী।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবদুর রহমান বলেন, পাঁচ বছর আগে গ্রামের মানুষের সহায়তায় খায়েরকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি নেয়নি। টাকার অভাবে পরে আর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন কোমরে শিকল বাঁধা থাকায় এখন খায়ের সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না। তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পেলে হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। কিন্তু আমি স্বল্প আয়ের মানুষ। নিজের সংসার চালিয়েই কষ্টে আছি। ভাইটার জন্য তেমন কিছুই করতে পারি না। আমাদেরও অনেক কষ্ট হয় তার জন্য।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সমাজের বিত্তবানেরা এগিয়ে এলে আবুল খায়ের হয়তো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারতেন। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে তিনি স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে চলে যাবেন। আরেক বাসিন্দা মোশারফ হোসেন বলেন, আবুল খায়েরের মতো একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে মানবিক সহায়তা ও সরকারি উদ্যোগ এখন খুব জরুরি। দ্রুত পদক্ষেপ নিলে হয়তো ২২ বছরের শিকল ছিঁড়ে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম সারোয়ার রাব্বী বলেন, ‘সম্প্রতি বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। একজন মানুষের এমন জীবনযাপন অত্যন্ত দুঃখজনক। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে ওই বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। তিনি পরিস্থিতি দেখেছেন। শিগগিরই আবুল খায়েরকে চিকিৎসার জন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমেও তার পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে।’