ঢাকার শিশুরা ডিজিটাল স্ক্রিনে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি সময় কাটানোর ফলে কতটা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, তা নিয়ে আইসিডিডিআরবি-র গবেষণার ফলাফল যারপরনাই উদ্বেগজনক। অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিনটাইম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। ডিজিটাল স্ক্রিনে বন্দী শৈশব এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ছয়টি স্কুলের ৬-১৪ বছর বয়সী ৪২০ শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা করে আইসিডিডিআরবি সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ শিশুর চারজনই দিনে দুই ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে।
ঘুমের উপর প্রভাব
গবেষণার আওতাভুক্ত শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বয়স অনুযায়ী যেখানে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, সেখানে অতিরিক্ত স্ক্রিনে আসক্ত শিশুদের গড়ে ঘুম হয় ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা।
শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমা যেখানে দুই ঘণ্টা, সেখানে ঢাকার শিশুরা গড়ে ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় মুঠোফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে কাটায়। এতে শিশুরা চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, স্থূলতা, ঘুম কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
ডিজিটাল স্ক্রিনে শিশুদের আসক্তি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশে এই প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা থেকে এই সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেল। ঢাকার স্কুলের শিশুদের মধ্যে গবেষণা হলেও সারা দেশের শিশুদের, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুদের ক্ষেত্রে এ চিত্রের খুব বেশি ব্যতিক্রম হবে বলে আমরা মনে করি না। করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বে যেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি দিন বন্ধ ছিল, তার মধ্যে বাংলাদেশ সামনের কাতারের একটি দেশ। এ সময় অনেক শিশুর মধ্যে মুঠোফোনসহ যে ডিজিটাল আসক্তি গড়ে ওঠে, সেখান থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট দেখা দিলেও ঢাকার কিছু স্কুলে অনলাইন ও সশরীর—মিশ্র পদ্ধতির ক্লাস চালু করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে শিশুদের ডিজিটাল আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশে সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
ডিজিটাল আসক্তির এই নীরব মহামারি থেকে শিশুদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে। তবে তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই সংকটের স্বীকৃতি প্রদান। প্রায় তিন কোটি মানুষের মহানগর ঢাকায় যেখানে অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠ প্রয়োজন, সেখানে কেন অর্ধেক মাঠও নেই? আরও বড় প্রশ্ন হলো, এসব মাঠের কয়টি শিশুদের খেলাধুলা ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত? সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার বেশির ভাগ স্কুলে শিশুরা কোথায় খেলবে, স্কুলের করিডরে নাকি সিঁড়িতে?
নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা
আমাদের নীতিনির্ধারকদের মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে যতটা আগ্রহ, শিশুদের স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের জন্য সেটা অনুপস্থিত। আইসিডিডিআরবির গবেষণা নিশ্চিত করেই নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। সরকার ও সিটি করপোরেশনের উচিত একটি শিশুবান্ধব নগর গড়ে তুলতে প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে খেলার মাঠ তৈরি করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকার মাঠ ও ঢাকার উদ্যানগুলো শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও তাঁদের সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিজেদের মুঠোফোন আসক্তি কমাতে হবে। আমাদের শিশুদের যেকোনো মূল্যে ডিজিটাল আসক্তি থেকে বাস্তব জগতে ফেরাতেই হবে।



