জলাতঙ্কের ভয়ে কুকুর নিধন নয়, প্রয়োজন টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ
জলাতঙ্কের ভয়ে কুকুর নিধন নয়, প্রয়োজন টিকা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশে জলাতঙ্ক সম্প্রতি নতুন করে আতঙ্কের নামান্তর হয়েছে। রাজধানী থেকে গ্রাম-সর্বত্র মানুষ কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। কোথাও টিকার সংকট, কোথাও চিকিৎসা পেতে বিলম্ব, কোথাও আবার অব্যবস্থাপনা। গাইবান্ধায় সম্প্রতি জলাতঙ্কে পাঁচ জনের মৃত্যুর ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সংকটের মাত্রা

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ টিকা নিতে ভিড় করছে। অথচ ২০২২ সাল থেকেই বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, স্থবির হয়ে আছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও। জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার উপসর্গ প্রকাশ পেলে মৃত্যুই প্রায় অবধারিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ এই রোগে মৃত্যুবরণ করে; যার অধিকাংশই এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বাংলাদেশও সেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

সমাধানের পথ

এই সংকটকে অবহেলা করার অবকাশ নেই; কিন্তু এর সমাধান কি শুধু কুকুর নিধন? কোনোভাবেই নয়। বরং এটি হতে পারে আরও ভয়াবহ ও অমানবিক এক সামাজিক প্রবণতার সূচনা। আমরা ইতিমধ্যেই দেখছি, 'জলাতঙ্কের ভয়' নামক অজুহাতে কোথাও কোথাও বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের দাবি উঠছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বহু দিন ধরেই বলে আসছেন, কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত টিকাদানই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পথ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্যাচ-নিউটার-ভ্যাকসিন-রিলিজ পদ্ধতি

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে 'ক্যাচ-নিউটার-ভ্যাকসিন-রিলিজ' পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ কুকুর ধরে তাদের নির্বীজকরণ, টিকাদান এবং পুনরায় এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া। এতে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে, জলাতঙ্কের ঝুঁকিও কমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে পারলে জলাতঙ্ক কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের ভূমিকা

সরকারের দায়িত্ব হবে বন্ধ থাকা টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করা এবং দেশব্যাপী জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে কার্যকর করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল পোষাপ্রাণী ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে এখন বহু মানুষ কুকুর ও বিড়াল পালন করে; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো বাধ্যতামূলক টিকার ব্যবস্থা নেই। ইউরোপ ও উন্নত বিশ্বের বহু দেশে প্রাণী পালনের জন্য কঠোর নীতিমালা রয়েছে। জার্মানিতে 'ডগ ট্যাক্স' চালু আছে; সিঙ্গাপুরে লাইসেন্স ও মাইক্রোচিপ বাধ্যতামূলক। বহু দেশে জলাতঙ্কের টিকার প্রমাণ ছাড়া প্রাণী পালনের অনুমতি মেলে না।

সামাজিক বিবেক

আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে আরও কঠোর আইন ও বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কারণ, তারা বুঝেছে একটি সমাজ শুধু তার অট্টালিকা বা অর্থনীতির দ্বারা সভ্য হয় না। তা বিচার করা হয় দুর্বল ও নির্বাক প্রাণীর প্রতি তার আচরণের মাধ্যমেও। এই সত্য আমাদেরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমরা যদি উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তাহলে শুধু মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই যথেষ্ট নয় আমাদের সামাজিক বিবেকও উন্নত হতে হবে।

যে সমাজ কুকুরকে শুধু ভয় বা ঘৃণার চোখে দেখে, যে সমাজ সমস্যার সমাধান হিসেবে হত্যাকেই সহজ পথ মনে করে, সেই সমাজ প্রকৃত অর্থে আধুনিক নয়। এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে অধিকাংশ বেওয়ারিশ প্রাণী মানুষের অবহেলারই ফল। মানুষ খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে নগরজীবনের এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে, আবার সেই পরিবেশে জন্ম নেওয়া প্রাণীকেই পরে 'উপদ্রব' বলে আখ্যা দেয়। কাজেই সমস্যার দায় একতরফাভাবে প্রাণীর উপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।

আইন ও নৈতিকতা

বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও পূর্বে কুকুর নিধনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এটি শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্নও বটে। আমরা যদি মানবিক পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হই এবং জনরোষ প্রশমনের জন্য নির্বিচারে প্রাণী হত্যা অনুমোদন করা হয়, তাহলে তা সভ্যতার পশ্চাদপসরণ বলেই গণ্য হবে। জলাতঙ্ক অবশ্যই ভয়ংকর; কিন্তু ভয়কে কেন্দ্র করে নিষ্ঠুরতা বৈধ করা আরও ভয়ংকর।

উপসংহার

আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক জনস্বাস্থ্যনীতি, দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ এবং প্রাণীর প্রতিও সহমর্মী দৃষ্টিভঙ্গি।