আইসিডিডিআরবি'র একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে। এই সময়সীমা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে।
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব
গবেষকরা জানান, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার নানা উপায়ে শিশুদের ক্ষতি করতে পারে। রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে, যা ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে যায়, ফলে স্থূলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সরাসরি মেলামেশা কমে যাওয়ার কারণে শিশুদের মন-মেজাজ, অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গতি
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
গবেষকের পরামর্শ
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবি-র সহকারী বিজ্ঞানী ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, “বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা না করা। কারণ এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে, যা তাদের সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।”
চোখের যত্নে '২০-২০-২০' নিয়ম
গবেষকরা শিশুদের চোখের যত্নে '২০-২০-২০' নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে।
স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস
স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস হিসেবে গবেষকরা বলেছেন, বিনোদনের জন্য স্ক্রিন টাইম সীমিত করতে হবে (প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি নয়), বাইরে খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রমে উৎসাহ দিতে হবে, পর্যাপ্ত ঘুম (৮-১০ ঘণ্টা) নিশ্চিত করতে হবে, ঘুমানোর আগে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে হবে এবং পরিবারের সঙ্গে ডিভাইস মুক্ত সময় কাটাতে হবে।
সুস্থ ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলা
গবেষকরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং শিশুদের বাড়িতে ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অদৃশ্য মহামারী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপমূলক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়।



