চিকিৎসা বিজ্ঞানে দশকের পর দশক ধরে চলা বিনিয়োগ এবং গবেষণার ফল মিলতে শুরু করেছে। গবেষকেরা ক্যানসারসহ অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধির বিরুদ্ধে আশাপ্রদ অগ্রগতির ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই চমৎকার উদ্ভাবনগুলোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো রোগটিকে পুরোপুরি নিরাময় বা নির্মূল করতে পারে না, বরং রোগীকে কেবল আরও কয়েক বছর বেশি বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ব্যয়
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। রোগ পুরোপুরি ভালো না হওয়ায় মানুষের কর্মক্ষমতার বছরগুলো কমে যায় এবং জীবনব্যাপী চিকিৎসার খরচ বাড়তেই থাকে। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায় হলো রোগ প্রতিরোধ করা, যে কাজে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখনও বেশ পিছিয়ে আছে।
অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে নতুন ওষুধের সাফল্য
সম্প্রতি বেশ কিছু ইতিবাচক খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খবরটি এসেছে রেভোলিউশন মেডিসিনস-এর অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের পরীক্ষামূলক চিকিৎসা থেকে। শেষ ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি সাধারণ কেমোথেরাপির তুলনায় রোগীর বেঁচে থাকার মেয়াদ দ্বিগুণ করে দেয়। সাধারণ চিকিৎসায় যেখানে রোগী গড়ে ৬.৭ মাস বাঁচতেন, এই নতুন ওষুধে তা বেড়ে ১৩.২ মাস হয়েছে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের মতো জটিল রোগ, যা এতদিন গবেষকদের ফাঁকি দিয়ে আসছিল, তার বিরুদ্ধে এটি বড় সাফল্য। তাছাড়া এই ওষুধটি যে মিউটেশনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, তা অন্যান্য ক্যানসারেও পাওয়া যায়। পাশাপাশি ইলাই লিলি কোম্পানির একটি পরীক্ষামূলক ওজন কমানোর ওষুধ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারির কাছাকাছি মাত্রায় ওজন কমাতে সক্ষম বলে দেখা গেছে।
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অনকোলস্টি জিক ইমানুয়েল বলেন, আজ আমরা যা দেখছি তা আসলে বিগত ৫০ বছর ধরে ছোট ছোট অংশ জোড়া লাগানোর ফল। এটি কোনও হঠাৎ পাওয়া ‘ইউরেকা’ বা রাতারাতি আবিষ্কারের গল্প নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পরিশ্রমের ফসল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সাবেক কমিশনার ডেভিড কেসলার বলেন, আমরা এখন বেশি বুদ্ধিমান হয়ে গেছি বলে এমনটা ঘটেছে তা নয়; বরং অতীতে আমরা বুদ্ধিমানের মতো বায়োফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণায় অনেক বড় বিনিয়োগ করেছিলাম বলেই আজকে এই ফল পাচ্ছি।
ভবিষ্যতের চিকিৎসা
বিজ্ঞানীরা এখন চিকিৎসার এমন এক রূপান্তরমূলক যুগের স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে রোগ অনেক আগেই ধরা পড়বে এবং পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব হবে। এ বছরের শুরুতে ইলাই লিলি-র অধিগ্রহণ করা আরেকটি পরীক্ষামূলক ওষুধ প্রাথমিক ট্রায়ালে শরীরে কোষ সম্পাদনার মাধ্যমে মাল্টিপল মায়োলোমা (এক ধরণের রক্তকণিকার ক্যানসার) আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে শতভাগ ইতিবাচক সাড়া দেখিয়েছে। অন্য একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, জিন-সম্পাদনা থেরাপির মাত্র একটি ইনফিউশন মানুষের কোলেস্টেরলের মাত্রা স্থায়ীভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যা হৃদরোগ প্রতিরোধের পথ খুলে দেবে। এ ছাড়া হেপাটাইটিস বি-র একটি শেষ ধাপের ট্রায়ালে ২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর নিরাময় মিলেছে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
তবে নতুন এই চিকিৎসাগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে যেমন উত্তেজনা রয়েছে, ঠিক তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন বিজ্ঞান তহবিলের অবস্থা এবং এফডিএ-র সক্ষমতা নিয়ে গবেষক ও ওষুধ শিল্পের মধ্যে এক ধরণের আশঙ্কাও কাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে আসা সবচেয়ে আধুনিক নিরাময়মূলক ওষুধগুলো; বিশেষ করে জিন থেরাপির মূল্য লাখ লাখ ডলার, যা বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার পথে বড় বাধা। অন্যদিকে ওজন কমানোর নতুন ওষুধগুলোও বেশ দামি এবং এর সুফল ধরে রাখতে হলে তা আজীবন খেয়ে যেতে হবে।
অধ্যাপক ইমানুয়েল প্রশ্ন তোলেন, যদি আমরা মানুষের সুস্থ থাকার মেয়াদ বাড়াতে চাই, তবে বিজ্ঞানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে, যা আমরা এখন একেবারেই করছি না।
সূত্র: অ্যাক্সিওস



