ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি বারবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা রোগীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ দিনই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যন্ত্রটি বন্ধ থাকে এবং দীর্ঘ সময় সচল না হওয়ায় রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি প্রায় প্রতিদিনই অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে। এর ফলে রোগীদের বাইরের রোগনির্ণয় কেন্দ্র বা হাসপাতালে গিয়ে দ্বিগুণ টাকা খরচ করে সিটি স্ক্যান করাতে হচ্ছে, যা গরিব রোগীদের জন্য আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীর বাগমারার ৭০ বছর বয়সী মানিক মিয়া লিভার সমস্যার কারণে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে চার দিন ধরে ভর্তি আছেন। চিকিৎসক তাকে পেটের সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দিলে তিনি বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ৮টায় স্বজনদের সঙ্গে সিটি স্ক্যান বিভাগে আসেন। এর আগে সাত হাজার টাকা জমা দিয়ে সিরিয়াল দেন। কিন্তু সেখানে এসে দেখেন সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট। এরপর থেকে মেঝেতে শুয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। বেলা আড়াইটার দিকে মেশিন সচল হওয়ার খবর পান। দীর্ঘ সাড়ে ছয় ঘণ্টা তাকে মেঝেতেই শুয়ে থাকতে হয়েছে, সঙ্গে স্বজনদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
বিকাল ৩টার দিকে মানিক মিয়া জানান, সকাল ৮টার আগেই ওয়ার্ডের নার্স স্যালাইন বন্ধ করে দিয়েছেন। পরীক্ষা করতে এসে দেখেন সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট, স্যালাইনও চলছে না। এরপর দুর্ভোগ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকতে হয়। আড়াইটার পর সিটি স্ক্যান করানো হয়।
শুধু মানিক মিয়া নন, সিটি স্ক্যান করাতে আসা সব রোগী ও স্বজনদের একই অবস্থা। মুক্তাগাছা থেকে ছেলে সোলায়মানের (১৭) মাথার সিটি স্ক্যান করার জন্য এসেছেন মা শরিফা বেগম। তিনি বলেন, ‘মাথায় ইটের আঘাত লাগায় চিকিৎসক আমার ছেলের মাথার সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দিয়েছেন। সিটি স্ক্যান করার জন্য দুই দিন ধরে চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার সিরিয়াল পেয়েছি। কিন্তু সকালে এসে দেখি মেশিন নষ্ট। বেলা আড়াইটার পর মেশিন চালু হয়েছে। এখন ৩টা বাজে। কখন পরীক্ষা করাতে পারবো জানি না। ছেলে সোলায়মান পাগলামি করতেছে। তাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট হওয়া এই দুর্ভোগ।’
যন্ত্রের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে সিটি স্ক্যান মেশিনটি স্থাপনের পর টানা ছয় বছর সার্ভিস দিয়েছে। যদিও মেশিনটির ওয়ারেন্টি ছিল পাঁচ বছরের। ইতিমধ্যে ওয়ারেন্টির সময় শেষ হয়েছে। এক বছর ধরে প্রায় সময় মেশিনটি নষ্ট হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে মেরামত করা হয়, কিন্তু কয়দিন সচল থাকার পর আবার নষ্ট হয়ে যায়। চালু থাকাকালে দিনে ১৫-২০ জন রোগীর সিটি স্ক্যান করা যায়। কিন্তু অনেক সময় নষ্ট থাকায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।
হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাপান থেকে আমদানি করা ১১ কোটি টাকা মূল্যের সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি হাসপাতালে স্থাপন করা হয়। মেশিনটি স্থাপনের পর জেলা ও জেলার বাইরে থেকে সাধারণ রোগী কম খরচে এখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারতেন। ছয়-সাত হাজার টাকায় সিটি স্ক্যান করা হয়, কিন্তু ক্লিনিক থেকে করতে হলে দ্বিগুণ টাকা খরচ হয়।
টেকনোলজিস্ট ও উপপরিচালকের বক্তব্য
সিটি স্ক্যান কক্ষের টেকনোলজিস্ট শাহজাহান বলেন, ‘আজ সকাল ৮টায় এসে সিটি স্ক্যান মেশিন চালু করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনোভাবেই কাজ হচ্ছিল না। ২০১৯ সালে হিটাচি ১২৮ স্লাইস মডেলের এই মেশিনটি বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে ওয়ারেন্টির সময় পার হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায়ই মেশিনের টিউব সমস্যা হওয়ায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। আজ সকালেও একই অবস্থা দেখা দিয়েছিল। পরে ইঞ্জিনিয়ার এসে অনেক চেষ্টা করে বেলা আড়াইটায় কোনোমতে সচল করেছেন। এখন ধীরে ধীরে পরীক্ষার কাজ চলছে। মেশিনটিতে প্রায় সময় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় রোগীদের পরীক্ষা করাতে বেশ সমস্যা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার এসে সিটি স্ক্যান মেশিন ঠিক করে দিয়ে গেছেন। এখন কাজ চলছে। রোগীদের তেমন ভোগান্তি হচ্ছে না।’



