ওজন কমানো, দ্রুত ফিট হওয়া কিংবা 'পারফেক্ট বডি' পাওয়ার আশায় এখন অনেক কিশোর-কিশোরী ভরসা করছেন এআই চ্যাটবটের ওপর। কী খাবেন, কত ক্যালোরি নেবেন, কত দিনে ওজন কমবে—এসব জানতে তারা ব্যবহার করছেন বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, এসব চ্যাটবট অনেক সময় ভুল, অসম্পূর্ণ এমনকি ক্ষতিকর খাদ্যপরামর্শও দিতে পারে; যা কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণার ফলাফল
গত ১১ মার্চ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রিয় কয়েকটি এআই চ্যাটবটের দেওয়া খাদ্যতালিকায় পুষ্টিগত ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন তুরস্কের ইস্তাম্বুল অ্যাটলাস ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানী বেতুল বিলেন এবং তার সহকর্মীরা। গবেষকদের মতে, চ্যাটবটগুলো বিভিন্ন ধরনের ডায়েট পরিকল্পনা দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা গেছে। অনেক খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনের তুলনায় ক্যালোরি ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ছিল কম, আবার প্রোটিন ও চর্বির পরিমাণ ছিল তুলনামূলক বেশি।
কিশোরদের জন্য ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেড়ে ওঠার বয়সে কিশোর-কিশোরীদের শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি, ভিটামিন, খনিজ ও সুষম পুষ্টি প্রয়োজন। কিন্তু অতি কম ক্যালোরির ডায়েট দীর্ঘমেয়াদে দুর্বলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, এমনকি খাওয়াদাওয়াসংক্রান্ত মানসিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। পুষ্টিবিদদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'স্লিম' বা 'ফিট' শরীরের চাপ এখন কিশোরদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআইয়ের সহজলভ্যতা। ফলে অনেকে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়াই চ্যাটবটকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যপরামর্শদাতা হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।
এআইয়ের সীমাবদ্ধতা
গবেষণায় আরও বলা হয়, এআই চ্যাটবট সাধারণত ইন্টারনেটে থাকা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করে। কিন্তু সব তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল বা হালনাগাদ নয়। এছাড়া ব্যবহারকারীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগব্যাধি, মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা জীবনযাপন—এসব বিবেচনায় না নিয়েও অনেক সময় চ্যাটবট খাদ্যতালিকা সাজিয়ে দেয়। এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম অত্যন্ত কম ক্যালোরির ডায়েট সাজেস্ট করেছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন গবেষণাটি বলছে, শুধু চরম ডায়েট নয়—সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতেও এআই অনেক সময় বিভ্রান্তিকর পরামর্শ দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
তবে বিশেষজ্ঞরা এআইকে পুরোপুরি বাতিলও করছেন না। তাদের মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রাথমিক তথ্য দিতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা বা ওজন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে শুধু চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। কারণ, ভুল ডায়েট শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, আত্মবিশ্বাস, শরীর নিয়ে উদ্বেগ এবং মানসিক চাপও বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্য। আর সেই ভারসাম্য নির্ধারণে এখনও মানুষের অভিজ্ঞতা ও পেশাদার পরামর্শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।



