বিয়ের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা জরুরি। এমন কিছু রোগ আছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু বিয়ের পরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বা সন্তানের মধ্যে ছড়াতে পারে। একটু সচেতন হয়ে আগে কিছু পরীক্ষা করালে রোগ ধরা সম্ভব, চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা বা পরিবারে বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
ডা. তাসনিম জারার পরামর্শ
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের চিকিৎসক ও সহায় হেলথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসনিম জারা একটি ভিডিওতে বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে ৬টি পরীক্ষার কথা বলেছেন।
১. থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা
ডা. তাসনিম জারা বলেন, প্রায় ১০ বছর আগের কথা। তিনি মেডিকেল কলেজে পড়ছিলেন। ফোন পেয়ে একজন রোগীর জন্য রক্তদান করতে গিয়েছিলেন। দেখলেন, যার রক্ত লাগবে সে একজন শিশু, বয়স মাত্র ১০-১১। প্রতি মাসে তার রক্ত নেওয়া লাগে। তার বাবা-মা বলছিলেন, প্রতি মাসে রক্ত জোগাড় করতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। শিশুটির রোগের নাম থ্যালাসেমিয়া। থ্যালাসেমিয়া সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা যায় সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। শিশুটির বাবা-মা পরীক্ষাটি আগে করাননি, তাই তারা জানতেন না যে তাদের সন্তানের এমন জটিল রোগ হতে পারে।
শিশুর এই রোগ এসেছিল বাবা-মায়ের কাছ থেকে। বাবা-মা দুজনেরই থ্যালাসেমিয়া মাইনর ছিল, কিন্তু তারা জানতেন না। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন, কোনো লক্ষণ ছিল না। বেশিরভাগ থ্যালাসেমিয়া মাইনর আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রেই এমন হয়। তারা সুস্থ থাকেন, কখনো কখনো একটু রক্তশূন্যতা দেখা যায়।
যখন সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মায়, তখন তারা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের নিজেদের থ্যালাসেমিয়া মাইনর ছিল। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। তাই করণীয় হলো, বিয়ের আগে দুজনেই রক্ত পরীক্ষা করান। তাহলে ধরা পড়বে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না।
পরীক্ষার ফলাফল তিন ধরনের হতে পারে: ১. দুজনের কারও রক্তে সমস্যা নেই – তাহলে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। ২. একজনের থ্যালাসেমিয়া মাইনর – তাহলেও দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই, তবে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মাইনর হওয়ার ৫০% সম্ভাবনা থাকে। ৩. দুজনেরই থ্যালাসেমিয়া মাইনর – তাহলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা আছে, তাই চিন্তাভাবনার ব্যাপার আছে।
২. হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা
হেপাটাইটিস বি একটি ভাইরাস যা লিভারে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু আক্রান্তরা অনেকেই জানেন না যে তারা সংক্রমিত। সুরক্ষা ছাড়া সহবাস করলে এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছড়াতে পারে। তাই বিয়ের আগে দুজনেই পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
৩. হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা
হেপাটাইটিস সি-ও লিভারের ক্ষতি করে। এটি সাধারণত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়, যেমন একই সুই ব্যবহার করলে। লিভার অনেকটুকু নষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত লক্ষণ দেখা যায় না। সুরক্ষা ছাড়া সহবাসের মাধ্যমে এবং মা থেকে সন্তানে ছড়ানোর সম্ভাবনা কম, তবে আছে। তাই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া শ্রেয়। পজিটিভ আসলে চিকিৎসা করে সম্পূর্ণ ভালো হওয়া যায়।
৪. এইচআইভি (HIV) পরীক্ষা
এইচআইভি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সহবাসের মাধ্যমে ছড়ায়। বহু বছর লক্ষণ নাও থাকতে পারে, ফলে অজান্তে ছড়াতে পারে। পরীক্ষা করিয়ে পজিটিভ আসলে ওষুধ শুরু করলে রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ কমে যায় এবং কয়েক মাসের মধ্যে আর কাউকে ছড়ানো যায় না।
৫. যৌনবাহিত রোগ পরীক্ষা
অনেকের যৌনবাহিত রোগ থাকে কিন্তু জানেন না। টেস্টের পরেই ধরা পড়ে। লক্ষণ না থাকায় টেস্ট হয় না, চিকিৎসাও হয় না, পরে সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। চারটি সাধারণ যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা করানো ভালো: সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্লামিডিয়া ও ট্রিকোমনায়াসিস। ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসা করে ছড়ানো ঠেকানো যায়।
৬. রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা
রক্তের গ্রুপ জানা জরুরি নয়, তবে ভালো। স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ এবং সন্তানের পজিটিভ হলে গর্ভাবস্থায় বা জন্মের পর একটি ইনজেকশন দিতে হয়। এছাড়া জরুরি অবস্থায় কাজে লাগতে পারে।
ডা. তাসনিম জারা আরও বলেন, এই পরীক্ষাগুলোর কোনো একটিতে রোগ ধরা পড়লেই যে বিয়ে করা যাবে না, তা নয়। অনেক রোগের চিকিৎসা আছে এবং ছড়ানো রোধের ব্যবস্থা আছে।



