ছয় বছরের শিশু মো. শহীদকে নিউমোনিয়া নিয়ে রোজা ঈদের আগে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করি। তখন তার শরীরে হামের লক্ষণ ছিল না। হাসপাতালে হামের রোগীর পাশেই তাকে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকেই আক্রান্ত হয়েছে আমার শিশু। চিকিৎসকরা আলাদা রাখতে বললেও অনেক অভিভাবক নিয়ম মানেনি।’ চলতি বছরের মার্চ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে শিশুসন্তান শহীদকে নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) আসা মা সাজিয়া আক্তার এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে অন্য শিশুদের সংস্পর্শে এসে আমার শিশু আক্রান্ত হয়ে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, কয়েক দিন আইসিইউতেও রাখতে হয়েছে। এভাবে আরও অনেক শিশু আক্রান্ত হয়। এর কারণ শুরুতে সব শিশুকে একসঙ্গে রেখে চিকিৎসা দিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে অন্য সুস্থ শিশুদের মাঝেও হাম ছড়িয়ে পড়ে।’
প্রথম শনাক্ত ও বিস্তার
২০২৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম ও উপসর্গের মৃত্যুর খবর আসে প্রথম। এরপর থেকে দেশের অন্য জেলা থেকেও হাম ও উপসর্গের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে প্রায় সব জেলায়। ইতিমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে মৃত্যু। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে এত দ্রুত সারা দেশে এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লো। কেন প্রতিরোধ করা গেলো না।
রাজশাহী বিভাগে প্রথম এই ভাইরাসের তীব্র প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ে, যা পরবর্তীতে প্রায় ৫৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রথমবারের মতো হাম শনাক্ত হয়েছিল ৪ জানুয়ারি। আর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায় এবং ১৮ মার্চের মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য বিভাগ।
হাসপাতালের ভূমিকা
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা সেখানে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হতে শুরু করে। হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ডের সীমাবদ্ধতা এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই ভাইরাসটি এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে আক্রান্ত শিশুরা সুস্থ হয়ে বা আংশিক সুস্থ অবস্থায় নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলে সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণশীলতা ও অসচেতনতাবাতাসের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার করে। হাম একটি চরম ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসনালীর নিঃসরণের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের কষ্ট
১৯ মে বিকালে রামেক হাসপাতালে ভেতরের খবরের অনুমতি না পেয়ে বাইরে থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর অভিভাবক রোজিনা খাতুনকে পাওয়া গেলো। তিনি এসেছেন নাটোর জেলার লালপুর এলাকা থেকে। চিকিৎসা পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়ে রোজিনা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মেয়েটার প্রথমে ঠান্ডা-জ্বর ছিল। আমরা সাধারণ জ্বর মনে করেছিলাম। পরে গায়ে ছোট ছোট লাল দানা উঠলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার জানান এটি হাম। হাসপাতালে এসে দেখি অনেক শিশুই একই সমস্যায় ভর্তি আছে। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসকরা খুব ব্যস্ত থাকেন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশুকে নিয়ে রাতে হাসপাতালে থাকা। বাচ্চা ঠিকমতো খেতে পারছে না, সারাক্ষণ কান্না করছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসন সংখ্যার তুলনায় রোগী থাকে প্রায় তিন গুণ। অনেক রোগীকে মেঝেতে থাকতে হয়, আবার ওয়ার্ডের ভেতরের মতো বারান্দাও রোগীতে পূর্ণ। সবচেয়ে বেশি ভিড় শিশু বিভাগে। সেখানে একেকটি বেডে তিন-চার জন, কখনও তারও বেশি রোগীকে রাখা হয়। এমন ঘিঞ্জি পরিবেশে এক রোগীর থেকে অন্য রোগীর মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছিল। এভাবেই অনেক শিশুর মধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মার্চের শুরুতে ঠান্ডা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু সিফাতের বাবা সাদিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি করেছিলাম শিশুকে। কিন্তু অন্য বাচ্চাদের সংস্পর্শে এসে হামে আক্রান্ত হয়। এরপর হামের বিস্তার বাড়তে থাকায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড খোলা হয়েছিল। ততদিনে কমবেশি হাসপাতালে থাকা সব শিশু আক্রান্ত হয়। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’
স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক। এই রোগের বিস্তার রোধে আমরা কাজ করছি। সংক্রমণের শুরু থেকে আলাদা ওয়ার্ডে রেখে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অনেকে তা মানেনি।’
হামে আক্রান্তদের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাসকে এই প্রতিবেদক তিনবার কল দিয়েছেন। কিন্তু রিসিভ করেননি। এমনকি মেসেজ দিলেও সাড়াও দেননি। ১৯ মে বিকাল সাড়ে ৪টার সময় সরেজমিনে প্রতিবেদন করার জন্য গেলেও হাসপাতালের ৩০-বি ওয়ার্ডে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা শংকর (রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস) স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া মেলেনি।
২২ মে রাত ৮টা ১১ মিনিটে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামকে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন। রাজশাহী থেকে হাম কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে এমন প্রশ্ন করতেই কল কেটে দেন। তাই রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনও জবাব মেলেনি।



