মঙ্গলের প্রাণের রহস্য: পৃথিবীতে এলিয়েন প্রমাণের সন্ধান
মঙ্গলের প্রাণের রহস্য: পৃথিবীতে এলিয়েন প্রমাণ

মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর চেয়ে ছোট এবং সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এটি পৃথিবীর চেয়ে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীতে যা ঘটেছিল, মঙ্গলেও সম্ভবত একই ঘটনা ঘটেছিল, তবে অনেক কম সময়ের মধ্যে। আমরা এটি নিশ্চিত করে জানি না, তবে মঙ্গলের বুকে অণুজীবদের বিশাল বাস্তুসংস্থান গড়ে ওঠা মোটেও অসম্ভব নয়।

মঙ্গলের চৌম্বকক্ষেত্র হারানো

দুর্ভাগ্যবশত, মঙ্গলের কপাল খারাপ ছিল। যখন এটি যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে গেল, তখন এটি তার চৌম্বকক্ষেত্র হারিয়ে ফেলল। পৃথিবীর মতো এর ভেতরে গলিত লোহার স্রোত বেশিদিন টেকেনি। ফলে এটি সূর্যের ভয়ংকর সৌরঝড়ের সরাসরি শিকার হলো। এর মহাকর্ষ বলও ছিল দুর্বল, ফলে এর প্রায় পুরো বায়ুমণ্ডলই ধীরে ধীরে মহাকাশে হারিয়ে গেল। এখন মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে বাতাসের চাপ পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ, যা মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ার বাতাসের চেয়েও পাতলা।

মঙ্গলে তরল পানি ও প্রাচীন হ্রদ

তবে মঙ্গলে পাঠানো বিভিন্ন রোবটযান আমাদের দেখিয়েছে, একসময় মঙ্গলের বুকেও তরল পানি ছিল। সেখানকার মাটিতে থাকা রাসায়নিক পদার্থ ও ঢেউয়ের ছাপ দেখে বোঝা যায়, অতীতে সেখানে বিশাল বন্যা হয়েছিল। হয়তো মাটির নিচে জমে থাকা বরফ আগ্নেয়গিরির তাপে বা গ্রহাণুর আঘাতে গলে গিয়ে এই বন্যার সৃষ্টি করেছিল। সেখানে শুকিয়ে যাওয়া প্রাচীন হ্রদের চিহ্নও পাওয়া গেছে, যেগুলো আকারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট লেকের মতোই বিশাল ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাসার রোভারদের অভিযান

বর্তমানে নাসার কিউরিওসিটি ও পারসিভারেন্স রোভার এই শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের বুকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং প্রাচীন প্রাণের সন্ধান করছে। এমনকি আজও মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে ক্ষণস্থায়ীভাবে তরল পানি বয়ে চলার প্রমাণ পাওয়া যায়, যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে এখন বাতাস এত পাতলা যে, পানি মুহূর্তের মধ্যেই উবে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়ানো রোবটযান অপারচুনিটি ২০০৪ সালের ১ মার্চ লাল গ্রহের এই ছবিটি তুলেছিল। পাথরে সালফেট এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি প্রমাণ করে, মঙ্গলের ওপর দিয়ে একসময় পানি প্রবাহিত হয়েছিল।

৪০০ কোটি বছর আগের মঙ্গল

কিন্তু ৪০০ কোটি বছর আগের গল্পটা ছিল অন্য রকম। মঙ্গলের প্রাচীন মহাসাগরগুলো কি ব্যাকটেরিয়া বা প্রোটোজোয়ার মতো সাধারণ অণুজীব দিয়ে গিজগিজ করত? আমরা জানি না, হয়তো কখনোই জানতেও পারব না। তবে ভবিষ্যতে হয়তো কোনো রোবটযান মঙ্গলের প্রাচীন পাথরে ফসিল খুঁজে পাবে।

পৃথিবীতে মঙ্গলের উল্কাপিন্ড

১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকার অ্যালান হিলস অঞ্চলে এক অদ্ভুত উল্কাপিন্ড পাওয়া গেল। সেখানে উল্কাপিন্ড খুঁজে পাওয়া তুলনামূলকভাবে বেশ সহজ, কারণ সাদা বরফের ওপর কালো পাথর খুব সহজেই চোখে পড়ে। সেখানকার শুষ্ক বাতাসের কারণে উল্কাপিন্ডগুলো বেশ ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।

এই বিশেষ উল্কাপিন্ডটির নাম দেওয়া হয় এএলএইচ৮৪০০১। এটি বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিল। পাথরটির রাসায়নিক গঠন মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠের পাথরের গঠনের সঙ্গে হুবহু মিলে গেল! পাথরটি তৈরি হওয়ার সময় এর ভেতরে গ্যাসের ছোট ছোট কিছু বুদবুদ আটকে ছিল। বিজ্ঞানীরা এই গ্যাসের উপাদানগুলোর অনুপাত মেপে দেখলেন, তা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের অনুপাতের সঙ্গে একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়! বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গেও এটি মিলিয়ে দেখেছিলেন, কিন্তু আর কোনো গ্রহের গ্যাসের অনুপাত মঙ্গলের মতো এত নিখুঁতভাবে মেলেনি।

এ থেকে একদম পরিষ্কার হয়ে গেল, এএলএইচ৮৪০০১ কোনো সাধারণ পাথর নয়। এটি আন্তঃগ্রহের এক আগন্তুক, লাল গ্রহ মঙ্গলের একটি পাথর! মঙ্গলের এই পাথরই যে প্রথম পৃথিবীতে এসেছে, তা কিন্তু নয়। এর আগে আরও অনেক পাথর পাওয়া গেছে। তবে পাথরগুলো কীভাবে পৃথিবীতে এল, সেটা বেশ মজার একটা ব্যাপার।

মঙ্গলের পাথর পৃথিবীতে আসার পথ

মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে এক ভয়ংকর ইতিহাসের ছাপ রয়েছে। সৌরজগতের অন্য সব গ্রহের মতো মঙ্গলও সারাজীবন ধরে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাত সহ্য করেছে। পৃথিবীর যেহেতু ঘন বায়ুমণ্ডল ও তরল পানি আছে, তাই এখানে মাটি বা পাথরের ক্ষয় দ্রুত হয়। কিন্তু মঙ্গলে এই ক্ষয়প্রক্রিয়া অনেক ধীর। তাই মঙ্গলের বুকে প্রাচীন সেই আঘাতের গর্ত এখনো স্পষ্ট দেখা যায়।

যখন এমন কোনো বড় সংঘর্ষ হয়, তখন ভূপৃষ্ঠের পাথর শূন্যে ছিটকে ওঠে। এর মধ্যে কিছু পাথর এতই প্রচণ্ড শক্তি পায় যে, সেগুলো গ্রহের মহাকর্ষ বল পেরিয়ে একেবারে মহাকাশে ছিটকে চলে যায়। এএলএইচ৮৪০০১ পাথরটি নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। জানা গেছে, এটি সৌরজগতের একদম শুরুর দিকে তৈরি হয়েছিল। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা ঠান্ডা হয়ে এটি পাথরে পরিণত হয়।

তারপর প্রায় পুরোটা সময় এটি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে বা এর ঠিক নিচেই পড়ে ছিল। এরপর এর ওপর এক ভয়ংকর আঘাত নেমে এল। মঙ্গলের বুকে আছড়ে পড়ল এক বিশাল গ্রহাণু। সেই ধাক্কায় পাথরটি ছিটকে চলে এল মহাকাশে। পাথরটির গায়ে মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতের চিহ্ন দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন, এটি অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ বছর ধরে সূর্যের চারদিকে ঘুরেছে। প্রতিবার নিজের গ্রহ মঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহাকর্ষের টানে এর পথ একটু একটু করে বদলাত। এভাবেই একসময় এর কক্ষপথ এতই বদলে গেল যে, এটি সূর্যের আরও কাছাকাছি চলে আসতে শুরু করল। এরপর প্রায় ১৩ হাজার বছর আগে আমাদের পৃথিবী এর চলার পথে পড়ে যায়। পাথরটি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ল—সোজা অ্যান্টার্কটিকার বরফে। তারপর কেউ তাকে খুঁজে বের করবে বলে সেখানে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল।

পাথরের ভেতরে প্রাণের সন্ধান

মঙ্গলের যে পাথরগুলো উল্কাপিন্ড হিসেবে পৃথিবীতে এসে পড়েছে, সেগুলো মূলত আরও বড় কোনো পাথরের আঘাতের ফলেই মহাকাশে ছিটকে এসেছিল। কোনা পাথর মহাকাশে ছিটকে আসার জন্য এটি নিশ্চয়ই ভয়ংকর একটি উপায়। কেউ ভাবতেই পারে, এমন ভয়ংকর আঘাতে তো পাথরগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার কথা, কিংবা অন্তত মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার কথা।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘটনা হয়তো তেমন নয়। যেমন, কোনো গ্রহাণু যদি একটু নিম্ন কোণ (লো-অ্যাঙ্গেল) থেকে আঘাত হানে, তবে পাথরগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ আলতোভাবেই শূন্যে ছিটকে উঠতে পারে। এর পেছনে হয়তো আরও কিছু কারণ আছে। আঘাতের কারণে বায়ুমণ্ডল ও পাথরের নিচ থেকে তৈরি হওয়া চাপের তরঙ্গও হয়তো এই ধাক্কাকে কিছুটা নরম করে দেয়।

যেভাবেই হোক না কেন, এএলএইচ৮৪০০১ পাথরটির ভেতরে থাকা খুব ছোট ছোট কাঠামো এই ভয়াবহ ধকল সামলে টিকে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা যখন পাথরটি পরীক্ষা করলেন, তারা এর ভেতরে একদম অক্ষত অবস্থায় থাকা অনেক কাঠামোর সন্ধান পেলেন। এর মধ্যে কিছু কাঠামো দেখে বোঝা যাচ্ছিল, পাথরটি অতীতে কোনো একসময় প্রবাহিত পানির সংস্পর্শে এসেছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এর ছবি তুললেন, তখন তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলেন!

মঙ্গলের ওই পাথরের ভেতরে ছোট ছোট সুতোর মতো গঠন দেখা গেল। দেখতে এগুলো অবিকল জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো! ১৯৯৬ সালে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলো। যে বিজ্ঞানীরা পাথরটি পরীক্ষা করেছিলেন, তারা বিশ্ববাসীকে জানালেন, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হয়তো ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে!

তাঁরা অবশ্য খুব সাবধানেই বলেছিলেন, এই প্রমাণ একেবারে শতভাগ নিশ্চিত নয়, তবে এটি অত্যন্ত জোরালো। সত্যি বলতে, ওই জীবাশ্মগুলোই ছিল তাঁদের প্রমাণের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। তাঁরা জোর দিয়েই বলেছিলেন, এগুলো হয়তো আদৌ কোনো জীবাশ্ম নয়। এগুলো হয়তো সাধারণ কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া গঠন।

মঙ্গলের পাথর এএলএইচ৮৪০০১-এর একটি অণুবীক্ষণিক ছবিতে ছোট সুতোর মতো বা কীটের মতো কিছু বস্তু দেখা যাচ্ছে। এগুলো দেখতে পৃথিবীর আদিম অণুজীবের মতো মনে হলেও এদের আসল উৎস এখনো অস্পষ্ট। এগুলো পৃথিবীর যেকোনো অণুজীবের চেয়েও অনেক ছোট। ছবির নিচের স্কেল বারটি আড়াআড়িভাবে ০.৫ মাইক্রন। তুলনা করার জন্য বলা যায়, মানুষের একটি চুলের প্রস্থ প্রায় ৫০ মাইক্রন।

কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো জীবাশ্মের ব্যাখ্যাটিই লুফে নিল। কথায় আছে না, ‘একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী!’ ওই ছবিগুলো ছাপিয়ে পত্রিকার লাখ লাখ কপি বিক্রি হতে লাগল। এটি তখন মিডিয়ায় এক বিশাল আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল।

কিন্তু বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে, পাথরের ভেতরে প্রাণের ওই প্রমাণগুলো একে একে প্রশ্নের মুখে পড়তে লাগল। বর্তমান পরিস্থিতি হলো, আমরা বড়জোর এটুকু বলতে পারি যে প্রমাণগুলো বেশ কৌতূহলোদ্দীপক এবং কিছু দিক থেকে এখনো জোরালো। তবে সবাই এ বিষয়ে একমত যে, মঙ্গলের প্রাচীন প্রাণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলার আগে আমাদের হাতে আরও অনেক উন্নত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আসতে হবে।

ভবিষ্যৎ মিশন ও চূড়ান্ত উত্তর

বিজ্ঞানের ভাষায় গ্রহ থেকে গ্রহে পাথরের মাধ্যমে অণুজীব বা প্রাণের এমন ছড়িয়ে পড়াকে প্যানস্পারমিয়া তত্ত্ব বলা হয়। অনেক বিজ্ঞানী ধারণা করেন, পৃথিবীতে প্রাণ হয়তো এভাবেই অন্য কোনো গ্রহ থেকে উল্কাপিন্ডের পিঠে চড়ে এসেছিল! সেটা মঙ্গল গ্রহও হতে পারে!

মঙ্গলে সত্যিই প্রাণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে নাসার পারসিভারেন্স রোভার বর্তমানে মঙ্গলের জেজোরো ক্র্যাটার নামে একটি প্রাচীন শুকিয়ে যাওয়া হ্রদ থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে টিউবে ভরে রেখেছে। মার্স স্যাম্পল রিটার্ন নামে যুগান্তকারী এক মিশনের মাধ্যমে ২০৩০-এর দশকের কোনো একসময়ে এই নমুনাগুলো পৃথিবীতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। পৃথিবীর অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে সেগুলো পরীক্ষা করলেই হয়তো এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া যাবে। তবে মার্কিনরা এই নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা, তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ। কেননা মার্কিন সরকার বর্তমানে এই নমুনা নিয়ে আসার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চাইছে না। তবে ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারের মন পরিবর্তন হলে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে আসতে পারে।