কঙ্গোতে ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮৮ জনের মৃত্যু, উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ভাইরাসটি
কঙ্গোতে ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮৮ জনের মৃত্যু

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল-রজার কাম্বা শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, এই ভাইরাসে ‘মৃত্যুর হার অনেক বেশি’। তিনি জানান, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ইবোলার বুনদিবুগিও ধরন দেখা যাচ্ছে, যার কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।

মৃত্যুর সংখ্যা ও আক্রান্তের সংখ্যা

আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি আফ্রিকা) সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। চিকিৎসা সহায়তাকারী সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে এবং বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

উগান্ডায় প্রথম মৃত্যু

প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এই ভাইরাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর নাগরিক ছিলেন। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ৫৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি রাজধানী কাম্পালায় মারা গেছেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, তিনি ইবোলার বুনদিবুগিও ধরনে আক্রান্ত ছিলেন, যা ২০০৭ সালে প্রথম শনাক্ত হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাদুর্ভাবের বিস্তার ও ঝুঁকি

সিডিসি আফ্রিকা জানিয়েছে, স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা শুক্রবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন এই প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করেছেন। এই প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে। এ অঞ্চলে এক দেশের মানুষের অন্য দেশে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে, যা ভাইরাসটি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আইজ্যাক নিয়াকুলিন্দা বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে আমরা মানুষকে মরতে দেখছি। অসুস্থ ব্যক্তিদের আলাদা করে রাখার কোনো জায়গা নেই। মানুষ বাড়িতেই মারা যাচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যরাই তাদের মৃতদেহ সৎকার করছেন।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম রোগী ও লক্ষণ

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা জানান, এই প্রাদুর্ভাবের প্রথম রোগী ছিলেন একজন নার্স। গত ২৪ এপ্রিল তিনি ইবোলার উপসর্গ নিয়ে প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়ার একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, রক্তক্ষরণ এবং বমি হওয়া।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

এমএসএফ জানিয়েছে, তারা এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং কর্মী পাঠাচ্ছে। এমএসএফ-এর জরুরি কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, ‘এত অল্প সময়ে আমরা যত আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঘটনা দেখছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। এর সঙ্গে ভাইরাসটি বিভিন্ন স্বাস্থ্য অঞ্চলে এবং এখন সীমান্তের ওপারেও ছড়িয়ে পড়েছে।’

বর্তমানে কেবল ইবোলার জায়ারে ধরনের জন্য টিকা পাওয়া যায়, যা ১৯৭৬ সালে শনাক্ত হয়েছিল। ওই ধরনে মৃত্যুর হার আরও বেশি, প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ। বুনদিবুগিও ধরনের জন্য কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।

ইবোলার ইতিহাস ও প্রভাব

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে এটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জয় ভট্টাচার্য শুক্রবার বলেন, ‘এটি অনেক বড় একটি প্রাদুর্ভাব।’

টিকা ও চিকিৎসার উন্নতির পরও গত ৫০ বছরে আফ্রিকায় ইবোলার কারণে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ গত আগস্টে দেশটির মধ্যাঞ্চলে ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, যাতে অন্তত ৩৪ জন মারা গিয়েছিলেন। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে ইবোলার সবচেয়ে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রতিরোধ

ধারণা করা হয়, ইবোলা ভাইরাসের উৎপত্তি বাদুড় থেকে। এটি একটি মারাত্মক রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। এর কারণে শরীরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয় এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, গত ৫০ বছরে ইবোলার প্রাদুর্ভাবগুলোতে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।

এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শারীরিক তরলের মাধ্যমে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়ায়। তবে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পরই কেবল আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মাঝে এটি ছড়াতে পারে। শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সরকারের পদক্ষেপ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুক্রবার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা থেকে বিমানে করে পাঁচ টন সুরক্ষাসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়। সংস্থাটি জানায়, ‘রোগের অনিশ্চয়তা এবং ভয়াবহতার কারণে, আক্রান্ত এলাকায় এটি কতটা ছড়াতে পারে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।’

১০ কোটির বেশি মানুষের দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো। আয়তনে এটি ফ্রান্সের চেয়ে চার গুণ বড় হলেও এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ। তাই এত বড় পরিসরে চিকিৎসাসামগ্রী পরিবহন করা এই দেশে বেশ কঠিন একটি কাজ।