অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী ক্যান্সার হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত দেরিতে ধরা পড়ায় এবং প্রচলিত চিকিৎসায় কম সাড়া দেওয়ার কারণে এটি মারাত্মক হয়ে ওঠে। তবে সম্প্রতি এক গবেষণায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
নতুন ওষুধ ডারাক্সোনরাসিব
গবেষণায় দেখা গেছে, ডারাক্সোনরাসিব নামক একটি নতুন ওষুধ উন্নত বা মেটাস্ট্যাটিক অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার সময় দ্বিগুণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এএসসিও ২০২৬ বার্ষিক সম্মেলনে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয় এবং 'নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার সহ-লেখক ও টেক্সাসের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের চিকিৎসক ডা. শুভম পান্ত বলেন, “এটি গত ৫০ বছরের মধ্যে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হতে পারে।”
কীভাবে কাজ করে
এই ওষুধটি মূলত ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিনগত পরিবর্তন কেআরএএস মিউটেশন লক্ষ্য করে কাজ করে, যা অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই মিউটেশনকে 'আনড্রাগেবল' বা ওষুধ দিয়ে লক্ষ্য করা প্রায় অসম্ভব বলে ধরা হতো। ডা. পান্ত বলেন, “কেআরএএস প্রোটিন এমন একটি সুইচের মতো, যা সবসময় 'অন' অবস্থায় আটকে থাকে। ডারাক্সোনরাসিব সেই সুইচকে বন্ধ করতে সাহায্য করে, ফলে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ হয়।”
গবেষকদের মতে, ডারাক্সোনরাসিব একটি নতুন শ্রেণির ওষুধ—আরএএস ইনহিবিটার, যা সক্রিয় আরএএস প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। এটি ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি থামিয়ে কোষ ধ্বংসে সহায়তা করে। ডা. পান্ত একে 'মলিকিউলার গ্লু' বা আঠার মতো একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন, যা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী সিগন্যাল বন্ধ করে দেয়।
রোগীর জীবনমানেও উন্নতি
শুধু বেঁচে থাকার সময়ই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে রোগীদের দৈনন্দিন জীবনমানেও উন্নতি হয়েছে। অনেক রোগীর ব্যথা কমেছে, ওজন হ্রাস ও হজমজনিত সমস্যা কম অনুভূত হয়েছে। টিউমার ছোট হয়ে যাওয়ায় ব্যথা ও অস্বস্তি কমেছে, ফলে রোগীরা তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে ছিলেন এবং ব্যথার ওষুধের প্রয়োজনও কম হয়েছে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
গবেষণায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ছিল ত্বকে র্যাশ, যা প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর মধ্যে দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া মুখে ঘা (স্টোমাটাইটিস), হালকা ডায়রিয়া ও বমিভাবও রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
বাজারে কবে আসবে?
বর্তমানে ওষুধটি যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি রোগীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে।
ভবিষ্যৎ গবেষণা
গবেষকরা ইতিমধ্যে 'আরএএসোলুট ৩০৩' নামে নতুন একটি ট্রায়াল শুরু করেছেন, যেখানে এই ওষুধটি প্রাথমিক পর্যায়ে কেমোথেরাপির সঙ্গে এবং এককভাবেও ব্যবহার করে আরও ভালো ফল পাওয়া যায় কি না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ওষুধটি বিশ্বব্যাপী অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি এটি ব্যাপকভাবে অনুমোদন ও সহজলভ্য হয়।
সূত্র: এনডিটিভি



