পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাপী নারীদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ ক্যান্সার, যার জন্য বর্তমান জীবনযাত্রাকে দায়ী করা হচ্ছে।
নাফিজার গল্প
পঞ্চাশোর্ধ্ব নাফিজা বেগমের তিন সন্তান। স্বামী ব্যবসায়ী। সম্প্রতি বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেঝ ছেলে ও ছোট মেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পরিবার নিয়ে ভালোই কাটছিল তাদের দিন। কিন্তু দু-এক মাস ধরে নাফিজার শরীর ভালো যাচ্ছিল না। আগের চেয়ে পেট ফুলে গেছে, অস্বস্তি লাগছে। অল্প কাজ করলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। পিঠে চিন চিন করে ব্যথা। খেতে ইচ্ছে করে না। স্বামীর পরামর্শে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখান। তিনি নাফিজাকে গাইনোলজিস্টের কাছে যেতে বলেন। গাইনোলজিস্ট কিছু পরীক্ষা দেন। রিপোর্টে জানা যায়, নাফিজা ডিম্বাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত।
ঝুঁকি ও পরিসংখ্যান
আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৮৭ জন নারীর মধ্যে একজনের ডিম্বাশয় ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে বেঁচে থাকার হার ৮৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ মতামত
স্কয়ার হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. মো. আকরাম হোসাইন বলেন, নারীদের তলপেটের দুই পাশে ডিম্বাশয় থাকে। সেখানে ক্যান্সার হলে তাকে ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যান্সার বলে। পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদেরই এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। যেসব নারীর তাড়াতাড়ি মাসিক শুরু হয় বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, তারাও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। জরায়ু ও কোলন ক্যান্সারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই ক্যান্সার নারীদের প্রজননতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। মেনোপজের পর, বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সে বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ অস্পষ্ট হওয়ায় প্রায়শই দেরিতে ধরা পড়ে।
লক্ষণসমূহ
- পেট ফুলে যাওয়া বা অস্বস্তি
- দ্রুত পেট ভরে যাওয়া
- পেলভিক বা তলপেটে ব্যথা
- ক্লান্তি ও পিঠে ব্যথা
- অস্বাভাবিক যোনি রক্তপাত (বিশেষ করে মেনোপজের পর)
৪৫-৫০ বছর বয়সের পর ঝুঁকি বাড়ে। মা বা বোনের এই ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি। চিকিৎসায় সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ ও কেমোথেরাপি অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে নিরাময়যোগ্য।
জরায়ুমুখ ও ডিম্বাশয় ক্যান্সারের পার্থক্য
বিশিষ্ট অনকোলজিস্ট ডা. কুদরত-ই-ইলাহী বলেন, অনেকেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার ও ডিম্বাশয় ক্যান্সার গুলিয়ে ফেলেন। জরায়ুতে সন্তান থাকে, এর মুখে ক্যান্সার হলে তা জরায়ুমুখের ক্যান্সার। অন্যদিকে, জরায়ুর দুই পাশে ফ্যালোপিয়ান টিউব থাকে, যার শেষ প্রান্তে ডিম্বাশয়। কাজেই এই দুই ক্যান্সার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি আরও বলেন, ওভারিয়ান ক্যান্সারের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং নেই। স্তন ক্যান্সারের মতো কাঠামোবদ্ধ স্ক্রিনিং নেই। তবে আলট্রাসনোগ্রাম ও ক্যান্সার মার্কার সি-১২৫ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।
ক্যান্সারের ধরন
ওভারিয়ান ক্যান্সার মূলত তিন ধরনের। বর্তমানে টাইপ নির্ধারণে মলিকুলার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে চিকিৎসা
ডা. কুদরত-ই-ইলাহী বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সম্ভব, তবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা সেবা এখনো রুট লেভেলে পৌঁছায়নি। তবে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো মানসম্পন্ন সেবা দিচ্ছে।
প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতন জীবনযাত্রার মাধ্যমে এই ক্যান্সার অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।



