ভালো রেজাল্টের পরও হতাশা: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংকট
ছবিটি প্রতীকী। প্রথম আলোর অনুরোধে মডেল হয়েছেন বিএল কলেজের শিক্ষার্থী আফ্রিদি। ছবি: সাদ্দাম হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো সিজিপিএ মানে খানিকটা স্বস্তি, স্বীকৃতি ও সামনে এগোনোর প্রেরণা, এমনটাই হওয়ার কথা। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ব্যাপারটা তেমন নয়। সহপাঠী-শিক্ষকদের প্রশংসা, পরিবারের আনন্দ, এসব প্রাপ্তি সত্ত্বেও তাঁদের অনেককে ঘিরে ধরে গভীর উদ্বেগ। খুব দ্রুতই সামনে এসে দাঁড়ায় এক কঠিন বাস্তবতা—পরের ধাপটা আদতে কী?
সাফল্যের পাশাপাশি সংশয়
কারণ, ভালো রেজাল্ট মানেই সব দরজা খুলে যাওয়া নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখায় না, সরকারি প্রতিষ্ঠানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুমুল। সব মিলিয়ে ভালো ফল অর্জনের পর যাত্রাটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। স্নাতকে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আফিয়া আহমেদ। অথচ প্রায়ই তাঁকে পরিচিতদের কাছ থেকে শুনতে হয় ঠেস দেওয়া কথা।
আফিয়া বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন, যেন ভালো রেজাল্টেরও কোনো মূল্য নেই। তখন নিজের মধ্যেই একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, ভালো রেজাল্ট দিয়েই-বা কী করব? কখনো কখনো এই ভাবনাগুলো হতাশ করে। এত পরিশ্রমের পরও যদি যথাযথ স্বীকৃতি বা সুযোগ না আসে, তাহলে এই অর্জনের মানে কী! তবু এই জায়গা থেকেই আবার শক্তি খুঁজে পাই। সবচেয়ে বড় কথা, আমার পরিবার সব সময় পাশে থাকে, সাপোর্ট করে। এই ভরসা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস ও সমর্থনই আমাকে আবার নতুন করে দাঁড়াতে শেখায়।’
সেই আত্মবিশ্বাসেই নিজেকে চাকরির জন্য প্রস্তুত করছেন আফিয়া। বর্তমানে মাস্টার্স পড়ুয়া এই শিক্ষার্থী বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে চান।
রেজাল্টের গুরুত্ব ও দক্ষতা
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রুবিনা ইয়াসমিন মনে করেন, ভালো রেজাল্টের গুরুত্বকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নিজ বিভাগের সর্বোচ্চ সিজিপিএ–৩ দশমিক ৮২ পাওয়া রুবিনা বলেন, ‘দেশের ভেতর ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে গেলে বা শিক্ষকতা পেশায় আসতে গেলে রেজাল্টই আপনার প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।’
তবে তিনি মনে করেন, ভালো ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে প্রতি বর্ষে ভাইভা, প্রেজেন্টেশন ও প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট যুক্ত করা জরুরি। তাঁর মতে, শুধু জিপিএ দিয়ে নয়, দক্ষতা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই চাকরির বাজারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবেন।
পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের সফলতা
ভালো ফল করা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সংশয়ের মধ্যেও আশা খুঁজে নিচ্ছেন কেউ কেউ। কথা হলো মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নরত শফিকুল তাঁর কলেজের সমন্বিত মেধাতালিকায় অনুষদ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। সিজিপিএ–৩ দশমিক ৩৯ পাওয়া এই শিক্ষার্থীর সফলতার মূলমন্ত্র ছিল সঠিক কৌশল।
তিনি বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, গাইডবই পড়লেই ভালো রেজাল্ট সম্ভব। কিন্তু আমি সব সময় মূল বইয়ের ওপর জোর দিয়েছি। এতে আমার বেসিক বা ভিত্তি মজবুত হয়েছে।’ নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বিগত পাঁচ থেকে সাত বছরের পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেছেন শফিকুল, যা তাঁকে পরীক্ষার ধরন বুঝতে সাহায্য করেছে। গণিত ও পরিসংখ্যানের মতো জটিল বিষয়গুলো তিনি নিজের মতো নোট তৈরি করে নিতেন, যেন পরীক্ষার আগের রাতে দ্রুত রিভিশন দেওয়া যায়। খাতার উপস্থাপনা, চিত্র ও গ্রাফের সঠিক ব্যবহার তাঁকে বাড়তি নম্বর পাইয়ে দিয়েছে।
শফিকুলের এই প্রাপ্তি শুধু একাডেমিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত পড়াশোনার সুফল তিনি চাকরির পরীক্ষায়ও পাচ্ছেন। ২০২৬ সালে তিনটি পরীক্ষা দিয়ে দুটির প্রিলিমিনারি পর্যায়ে পাস করেছেন তিনি, যা তাঁকে বিসিএসের লক্ষ্য পূরণে সাহস দিচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতা
ভালো ফল করেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার এক ভিন্ন গল্প শোনালেন ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আলমিনা আক্তার। তাঁর সিজিপিএ–৩ দশমিক ৮০, আইইএলটিএস স্কোর ৭। কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আবেদন করতে গিয়ে বড় হোঁচট খেয়েছেন তিনি।
আলমিনা বলেন, ‘কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যখন আবেদন করতে গেলাম, দেখলাম তারা একাডেমিক ফলের পাশাপাশি থিসিস, রিসার্চ বা প্রজেক্ট ওয়ার্ককে অনেক গুরুত্ব দেয়। কিন্তু আমাদের কারিকুলামে এসব সুযোগ নেই বললেই চলে।’
পুরো বিষয়টিকে তাই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে নয়; বরং পদ্ধতিগত সমস্যা হিসেবে দেখতে চান আলমিনা। মেধা ও আগ্রহ সত্ত্বেও অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ায় আলমিনার কথায় প্রকাশ পেল আক্ষেপ। বলছিলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে শুধু সার্টিফিকেটের চেয়ে প্র্যাকটিক্যাল স্কিল বা গবেষণা অভিজ্ঞতার দাম বেশি। যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চায়, তাদের জন্য অনার্স পর্যায়েই বাধ্যতামূলক থিসিস ও প্রজেক্ট ওয়ার্কের ব্যবস্থা করা উচিত। অন্যথা মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আমার মতো অনেক শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।’
কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
চট্টগ্রামের সরকারি কমার্স কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম খলিল তুলে ধরলেন অবকাঠামোগত পার্থক্যের কথা। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী স্নাতক করেছেন চট্টগ্রামের বার আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে। ফলাফলে প্রথম হওয়া ইব্রাহিমের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোয় একাডেমিক পরিবেশের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিনার আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগের যে সুযোগ থাকে, আমাদের এখানে তা অনেক কম। পাঠ্যক্রম যদি আরও ভালো হয়, ইন্টার্নশিপের সুযোগ যদি বাড়ানো যায়, তাহলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা আরও ভালো করবেন। চাকরির বাজারেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাঁরা প্রথম দিকে থাকেন, তাঁরা আলাদাভাবে কোনো বাড়তি সুযোগ পান না। এই সুযোগগুলো বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা ভালো রেজাল্ট করতে আরও অনুপ্রাণিত হবেন বলে আমি মনে করি।’
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সে ধরনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত বিসিএসকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে এগোতে থাকেন। কিন্তু শুধু বিভাগে ভালো ফল করলেই যে সবাই বিসিএসে ভালো করবেন, বিষয়টি তেমনও নয়।
তাই এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য কলেজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য জব প্রিপারেশন ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা হচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যেন তাঁরা চাকরির বাজারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে সেখানকার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।



