বিসিএসের উন্মাদনা: উচ্চশিক্ষার লাইব্রেরিতে রাজত্ব করছে গাইড বই, মেধাবীদের ক্যারিয়ার ভাবনায় সংকট
বিসিএস উন্মাদনা: লাইব্রেরিতে গাইড বই, মেধাবীদের ক্যারিয়ার সংকট

বিসিএসের উন্মাদনা: উচ্চশিক্ষার লাইব্রেরিতে রাজত্ব করছে গাইড বই, মেধাবীদের ক্যারিয়ার ভাবনায় সংকট

সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে লাইব্রেরিতে ঢুকতে মধ্যরাত থেকেই ব্যাগ রাখার লাইন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দৃশ্য কয়েক বছর আগের হলেও বর্তমান অবস্থা একই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার চেনা ছবিটা এখন আমূল বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে এখন আর মৌলিক গবেষণার বইয়ের ভিড় নেই; বরং সেখানে পুরোপুরি রাজত্ব করছে নীলক্ষেতের বিসিএস গাইড বই। ক্লাসের একাডেমিক পড়াশোনায় মন দেওয়ার চেয়ে স্নাতক জীবনের প্রথম বর্ষ থেকেই মেধাবী তরুণদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠছে বিসিএস ক্যাডার হওয়া।

এই প্রবণতার কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের মূল পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বিসিএস পরীক্ষায় টেকার কৌশলে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, মেধাবীদের ক্যারিয়ার ভাবনায় বিসিএসই কেন একমাত্র গন্তব্য হবে? রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) এক বিশেষ আলোচনা সভায় নীতিনির্ধারকরা এই গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেন।

'সামাজিক ব্যাধি' হিসেবে বিসিএস উন্মাদনা

পিএসসি আয়োজিত 'সিভিল সার্ভিস নিয়োগে মেধা ও জন-আস্থা শক্তিশালীকরণ' শীর্ষক ওই প্যানেল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বিসিএস নিয়ে প্রচলিত এ উন্মাদনাকে সরাসরি এক 'সামাজিক ব্যাধি' হিসেবে অভিহিত করেন। পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর উপস্থিতিতে তিনি এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাহেদ উর রহমান প্রশ্ন তোলেন, স্নাতক জীবনের শুরু থেকেই নিজের একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে কেন একজন শিক্ষার্থীকে একটি চাকরির পেছনেই কয়েক বছর নষ্ট করতে হবে? তাঁর মতে, এই আসক্তি মেধাবী জনশক্তি গঠনের পথে বড় অন্তরায়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর প্রায় পৌনে চার লাখ তরুণ এ প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামছেন।

  • ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে অংশ নেওয়া ৩ লাখ ৭৪ হাজার প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ হাজার ৬৪৪ জন পরবর্তী ধাপের জন্য টিকেছেন।
  • চূড়ান্তভাবে ক্যাডার হওয়ার সুযোগ পান মাত্র ১ শতাংশের কম প্রার্থী।
  • এই বিশালসংখ্যক তরুণের ব্যর্থতা ও বারবার একই মোহের পেছনে ছুটে চলা প্রজন্মের মধ্যে গভীর হতাশা জন্ম দিচ্ছে।

মেধাবীদের অদ্ভুত বাস্তবতা

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা। অনেক মেধাবী তরুণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক কিংবা ভালো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কর্মরত থেকেও কেবল 'ক্যাডার' পদের মোহে বছরের পর বছর এ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা বা সৃজনশীল কোনো পেশার পরিবর্তে তরুণেরা তাদের শ্রেষ্ঠ সময়টি ব্যয় করছেন গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যায়।

প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা মত দেন যে সিভিল সার্ভিসের এই তীব্র মোহ থেকে তরুণদের বের করে আনা না গেলে মেধাবীদের একটি বড় অংশ সৃজনশীল পেশার বদলে কেবল প্রশাসনিক জীবনের শৃঙ্খলে বন্দী থাকবে। অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে একাডেমিক শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা জরুরি।

  1. বিসিএসের এই সামাজিক উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণে এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাহসী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
  2. পিএসসির এ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
  3. শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্যবই ও গবেষণায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে জোর দাবি উঠেছে।

বিসিএসের এই উন্মাদনা শুধু চাকরির প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি এখন উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ও মেধাবীদের ক্যারিয়ার বিকাশের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এই সতর্কবার্তা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ভাবনায় নতুন দিক নির্দেশনা দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।