ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের গেস্টরুমে জুনিয়রদের 'আদব-কায়দা' শেখানোর নামে নির্যাতনের সংস্কৃতির ভয়াবহ বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন সংগঠনেরই এক নেতা। নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক উপ দপ্তর সম্পাদক আরিফ ইশতিয়াক রাহুল ফেসবুকে তার নিজের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, যা তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
২০২২ সালের ভয়াবহ রাতের স্মৃতি
রাহুল তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে তিনি গেস্টরুমে নির্যাতনের শিকার হন। তিনি লিখেছেন, 'আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক রাতের স্মৃতি। যেগুলো বলার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি বেশ কিছু বছর।' তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে দল ক্ষমতায় থাকাকালীন এই ঘটনা প্রকাশ করলে ছাত্রলীগ চাপে পড়তে পারত, তাই তিনি চুপ ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে বাধ্য হয়েছেন।
নির্যাতনের পটভূমি
রাহুলের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন ছিল পহেলা বৈশাখ এবং তিনি মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। সকালে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের সাথে একটি ছবি তোলার পর থেকে তার ওপর সিনিয়রদের রাগ বাড়তে থাকে। রাতে তিনি যখন হলে ফিরছিলেন না, তখন বারবার ফোন কলের মাধ্যমে তাকে গেস্টরুমে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়।
গেস্টরুমে ভয়াবহ নির্যাতন
রাহুল লিখেছেন, ১০৮ নং রুমে গেস্টরুমে প্রবেশ করার পর তাকে একা রেখে অন্য সবাইকে বের করে দেওয়া হয়। সেখানে ১৫-২০ জন সিনিয়র তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। তিনি উল্লেখ করেছেন:
- চড়-থাপ্পড় ও বালিশ দিয়ে মারধর করা হয়।
- লাইট বন্ধ করে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে থাপ্পড় মারা হয়, যার ফলে তিনি মেঝেতে পড়ে যান।
- লাথি, পা দিয়ে ডলা দেওয়া এবং ফুটবলের মতো শট মারা হয়, যা তার কোমরে গুরুতর আঘাত করে।
- তার ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করা হয় এবং খায়রুজ্জামান লিটনের নামে একটি ফেসবুক পেইজ খোলার অভিযোগ তোলা হয়।
তার 'অপরাধ' হিসেবে উল্লেখ করা হয়:
- মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার জন্য অনুমতি না নেওয়া।
- সাদ্দাম ভাইয়ের সাথে ছবি তোলা।
- মুন ভাইকে ছবিতে যোগ দিতে বলা।
চিকিৎসা ও বাড়তি শাস্তি
নির্যাতনের পর রাহুলের শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, কিন্তু ডাক্তারও ঘটনা গোপন রাখেন। হলে ফিরে আসার পর তাকে আরেক দফা গেস্টরুমের মুখোমুখি হতে হয় এবং ৭ দিনের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাকে সকাল হওয়ার আগেই হল ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং তিনি অন্যান্য হলে আশ্রয় নেন।
দীর্ঘদিন চুপ থাকার কারণ
রাহুল ব্যাখ্যা করেছেন যে তিনি এতদিন চুপ ছিলেন কারণ ঘটনা প্রকাশ পেলে ছাত্রলীগের ওপর দায় বর্তাত এবং তিনি হলে থাকতে পারতেন না। তিনি লিখেছেন, 'যারা এভাবে নির্যাতন করেছে তারাও জানত, আমাকে যতই মারুক, আমি ঘটনা গোপন রাখব। তাই বার বার আমাকেই মেরেছে।' তিনি দাবি করেন, এরকম ৮টি সিঙ্গেল গেস্টরুমের স্মৃতি তার আছে।
অতিরিক্ত অভিযোগ
রাহুল পরবর্তীতে আরেকটি পোস্টে আরবি বিভাগের ছাত্র ও এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আরিফুজ্জামান সৌরভের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। তিনি দাবি করেন, সৌরভ শিবিরের রাজনীতি করে এবং ফেসবুকে জামাত-শিবিরের পক্ষে অ্যাক্টিভিজম চালায়।
উল্লেখ্য, রাহুল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বহিষ্কৃত ১২৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন। তার এই প্রকাশ্যে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।



