মাউশি ও এনসিটিবিতে নেতৃত্ব সংকট: প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় চলছে। এই সংস্থায় ছয় মাস ধরে নিয়মিত মহাপরিচালক (ডিজি) নেই, এবং সম্প্রতি যিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে উল্লেখযোগ্য গতি আসছে না, যা শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
এনসিটিবিতেও চেয়ারম্যান পদ শূন্য
অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৫ সালের মার্চ থেকে প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত চেয়ারম্যানবিহীন অবস্থায় রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী গত বছরের ৬ নভেম্বর অবসর-উত্তর ছুটিতে গেলে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে মতিঝিলে অবস্থিত এনসিটিবিতেই নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু নিয়মিত নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
নিয়োগ বিলম্বের কারণ নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংকট তৈরি হলেও, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পরেও শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ না হওয়ায় বিলম্বের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজন ছিল, যা এখন শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ মাসের মধ্যেই নিয়োগ দেওয়া হবে, তবে এই বিলম্ব শিক্ষা খাতের উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মাউশির গুরুত্ব ও নেতৃত্ব সংকটের ইতিহাস
মাউশি দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও নীতি বাস্তবায়নের প্রধান সংস্থা হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও এই অধিদপ্তরের আওতায় হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের পদটি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পদ হিসেবে বিবেচিত। সারা দেশের নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নিয়ে এটি শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক কাঠামো।
তবে, মাউশির মহাপরিচালক পদটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ১৪ অক্টোবর তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানকে সরিয়ে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। এর আগে একই বছরে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক এহতেসাম উল হককে মাত্র ২০ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টানা এই পরিবর্তন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পদটি কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
অতিরিক্ত দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা
এত দিন সংস্থাটির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) বি এম আবদুল হান্নান অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মহাপরিচালকের কাজ চালিয়ে আসছিলেন; কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৯ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে সরকারি তিতুমীর কলেজে সংযুক্ত করা হয়েছে। মাউশির একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার বিকেলে তাঁরা এই প্রজ্ঞাপন পেয়েছেন। একই দিন অধিদপ্তরের কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক নিয়োগ পেয়েছেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. নাজমুল হক, যিনি ফরিদপুরের মধুখালীর সরকারি আইন উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।
এখন মাউশির নিয়মিত মহাপরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কলেজ ও প্রশাসন শাখার নতুন পরিচালককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন মাউশির কর্মকর্তারা। তবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে মাউশির মতো এত বড় সংস্থার কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সাময়িকভাবে কাজ চালানো যায়; কিন্তু এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।



