কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ ও নতুন প্রজন্মের দায়িত্বের আহ্বান
কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে মঙ্গলবার দুপুরে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার ও চেতনা ধারণের আহ্বান জানানো হয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার আয়োজনে ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী এই অলিম্পিয়াড প্রথমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস ও নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ও কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক এম সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম যদি সঠিক ইতিহাস জানতে না পারে, তাহলে জাতি বিভ্রান্ত হবে, দেশপ্রেম হারিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি আরও জোর দেন যে, মুক্তিযুদ্ধ জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় এবং এই ইতিহাসকে বিকৃত করা বা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কক্সবাজার জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক এম রুহুল আমিন মুকুল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে লাল–সবুজের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, কিন্তু গত পাঁচ দশকে এই ইতিহাস নানাভাবে বিকৃত করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও কক্সবাজারের ইতিহাস
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কক্সবাজার ইউনিটের যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। শহীদ সুভাষ–ফরহাদসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছি। শত শত মা–বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। সেই ত্যাগের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না।’
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও কক্সবাজারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমন ঘটে ৫ মে। তখন ক্যাপ্টেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সুবহানের নেতৃত্বে কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়েন এবং ১২ ডিসেম্বর কক্সবাজার শত্রুমুক্ত হয়।
অলিম্পিয়াডের আয়োজন ও বিজয়ীদের পুরস্কার
অনুষ্ঠানটি বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ছৈয়দ করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা লাল–সবুজের বাংলাদেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস মনে–প্রাণে ধারণ করে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে আজকের প্রজন্মকে জাগ্রত থাকতে হবে।’ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো কক্সবাজার বন্ধুসভার সভাপতি আবদুল নবী ও সাধারণ সম্পাদক উলফাতুল মোস্তফা।
অনুষ্ঠানের আগে বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ২০০ শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড কুইজে অংশ নেয়। সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে পাঁচজনকে কুইজ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিজয়ীদের তালিকা নিম্নরূপ:
- প্রথম: দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসহাত রহমান ওয়ারিশা
- দ্বিতীয়: ষষ্ঠ শ্রেণির আরাওয়া সুলতানা নাজনীন
- তৃতীয়: অষ্টম শ্রেণির আরিফ আদনান
- চতুর্থ: দশম শ্রেণির আফরা রাইহানা
- পঞ্চম: দশম শ্রেণির রাইশা জান্নাত তাসনিন
পুরস্কার হিসেবে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের বই তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা। এই আয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



