ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে উপাচার্যের স্পষ্ট বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণার মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাসে রাজনীতির প্রভাব এবং বিগত প্রশাসনের বিতর্কিত ঘটনাবলি নিয়ে নিজের অবস্থান ও দর্শন ব্যক্ত করেছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন।
গবেষণা উন্নয়নে একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশনের পরিকল্পনা
উপাচার্য হিসেবে তার মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির কাছে একটি পথিকৃৎ এবং প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এটি যে অবস্থানে আছে, সেখান থেকে একে বিশ্বদরবারে আরও সুপরিচিত করতে হবে।” বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে শিক্ষা ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “গবেষণার মান যদি আমরা বিশ্বমানে উন্নীত করতে না পারি এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে না পারি, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।” এর জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডের প্রয়োজন রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সরকার যে বাজেট দেয়, তার সিংহভাগ বেতন-ভাতায় চলে যায়; গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে সামান্যই। তাই তার চিন্তা হলো ‘একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি’ কোলাবরেশন বা শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো।
- অ্যালামনাইদের মধ্যে যারা শিল্পপতি আছেন, তাদের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
- আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির জন্য যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
- গবেষকদের উৎসাহিত করতে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে জোরালো আবেদন জানানো হবে।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকার জন্য গবেষণাসহ র্যাংকিংয়ের প্রতিটি প্যারামিটার বা সূচকের উন্নয়নে কাজ করা হবে বলে তিনি জানান। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়াটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি তার টিম ও হবু উপ-উপাচার্যদের নিয়ে গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছেন।
ক্যাম্পাসে রাজনীতির প্রভাব: ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক নির্ভরতা বেশি হয়ে গেছে বলে অনেকের ধারণা থাকলেও উপাচার্য রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। তিনি বলেন, “রাজনীতিই সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। রাজনীতির দর্শন বা আদর্শ কখনও খারাপ নয়, তবে এর নেতিবাচক প্রয়োগ নিন্দনীয়।” ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে— প্রকাশ্য হোক বা সুপ্তভাবে।
তবে তিনি চান, রাজনীতি যেন বিশ্ববিদ্যালয়কে কলুষিত না করে। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলবেন, “যার রাজনীতি তার কাছে থাকুক, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় সবার।” তিনি যখন এই চেয়ারে বসেছেন, তখন তার পরিচয় তিনি সর্বজনীন উপাচার্য অর্থাৎ সবার জন্য। তিনি সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অভিভাবকদের জন্য দায়বদ্ধ। তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস যেন তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনও প্রভাব না ফেলে— এটি নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য।
বিগত প্রশাসনের বিতর্কিত ঘটনাবলির মূল্যায়ন
বিগত প্রশাসনের সময় তোফাজ্জল বা সাম্য হত্যা এবং নারীদের চলাচলে অলিখিত নিষেধাজ্ঞার মতো কিছু বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে। বিকাল ৫ টার পরে নারীরা সেন্ট্রাল ফিল্ডে ঢুকতে পারতো না— এটা একটা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, “একেকজন মানুষের কাজের ধরন ও নেতৃত্বের শৈলী ভিন্ন। আমি নিজেকে সেরা দাবি করি না, আমার চেয়েও যোগ্য মানুষ থাকতে পারেন।”
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা একটি ‘টিম ওয়ার্ক’। উপাচার্য, প্রক্টরিয়াল টিম, ডিন, প্রভোস্ট ও ছাত্র সংসদ (ডাকসু)— সবাই মিলে একটি দল। এই দলের নেতা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, তবে সবাই তা সাদরে গ্রহণ করে। বিগত সময়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, তাকে তিনি সাধুবাদ জানান। সেই উত্তাল সময়ে দায়িত্ব পালন করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, “আমি বলবো না যে তিনি কিছুই করেননি; অবশ্যই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলের জন্য চেষ্টা করেছেন। তবে মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে।” তৎকালীন দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকাকে তিনি ইতিবাচকভাবেই দেখেন এবং কোনও বিচ্যুতি থাকলে তাকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা হিসেবেই বিবেচনা করেন।
ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অবস্থা সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র। এখানে প্রত্যেকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং তিনি কাউকে বাধা দিতে পারবেন না। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনও সিদ্ধান্ত সামষ্টিক স্বার্থবিরোধী না হয়। কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ব্যক্তিগত দাবির চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়নই মুখ্য। সব সংগঠনই তাদের আদর্শিক চর্চা করবে, তাতে তাদের দ্বিমত নেই।
পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করতে হবে। কেবল সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর না করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও ডিবেটিংয়ের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বর্তমান করপোরেট বিশ্বে চাকরির ক্ষেত্রে লিডারশিপ কোয়ালিটি বা নেতৃত্বগুণ অত্যন্ত জরুরি, যা এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
গবেষণার বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার অবস্থা সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা বা যুদ্ধবিগ্রহের প্রভাব সবখানেই পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত মেধাবী গবেষক রয়েছেন, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা তাদের বড় দায়িত্ব। সবার নেটওয়ার্কিং বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সমান নয়। যাদের যোগাযোগ ভালো তারা ফান্ড আনতে পারেন, অন্যদের গবেষণা ফান্ড স্বল্পতায় কিছুটা দুর্বল হয়। তবে তাদের শিক্ষকদের গবেষণার সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তারা পরিবেশ উন্নত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
জুলাই আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বার্তা
জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে। আবার নিষিদ্ধ সংগঠনের অনেক শিক্ষার্থী যারা হামলায় ছিল না, তারা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরতে ভয় পাচ্ছে। তাদের জন্য উপাচার্যের বার্তা হলো, তিনি উপাচার্য হিসেবে মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ঈদের ছুটির পর আজই প্রথম দাফতরিক কাজ শুরু হয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন তদন্ত কমিটি বা বডি কাজ করছে। তাকে কিছুটা সময় দিতে হবে। তিনি ফাইলগুলো পর্যালোচনা করবেন এবং তথ্য নেবেন।
তিনি বলেন, “আমি চাই না আমার মাধ্যমে কোনও ভুল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক। তবে এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে, আমার কাছে সবাই ন্যায়বিচার পাবে।” তিনি পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেবেন।



