জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নকলমুক্ত পরীক্ষাসহ কারিকুলামে বড় পরিবর্তন আসছে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নকলমুক্ত পরীক্ষাসহ বড় পরিবর্তন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেছেন, পরীক্ষায় অসদুপায় ও নকল বন্ধসহ শিক্ষা কারিকুলামে সংশোধন আনা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধন শেষে আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধন

অধিভুক্ত কলেজগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজীকরণ, ভর্তি, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং দীর্ঘদিনের সেশনজট কমাতে ময়মনসিংহ নগরের মধ্য বাড়েরা গ্রামের আদুর বাড়ি বাইলেন সড়কের এক নম্বর বাড়িতে দেশের ১১তম কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। সকাল ১০টায় কেন্দ্রটির উদ্বোধন শেষে নগরের টাউন হলের তারেক স্মৃতি অডিটরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষা কারিকুলামে সংশোধন

উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষা কারিকুলাম ইতিমধ্যে দুবার সংশোধন হয়েছে এবং তৃতীয়বারের জন্য প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি, ট্রেড কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা প্রায় উনচল্লিশটি সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। এর মধ্যে কিছু ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, আর কিছু সম্পন্ন করতে আরও সময় প্রয়োজন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

উপাচার্য বলেন, ১৯৯২ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের উচ্চশিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বছরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ গ্র্যাজুয়েট চাকরি পাচ্ছে না উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী চাকরি পাচ্ছে না। এই হিসাব অনুযায়ী, ১০ বছরে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী বেকার থেকে যাবে। অর্থাৎ আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে আছি যেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পরও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না, যা রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কখনোই এমন হওয়ার কথা নয়।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখ করে অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ জানান, এখানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০–এর মতো অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সবাই অবগত। এই শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় এ কথা শুরু থেকেই বলা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বলা হবে।

মৌলিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, সিলেবাস যুগোপযোগী করতে হবে। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। ল্যাবগুলোকে কার্যকর করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এমন বিষয়গুলো পড়াতে হবে, যেগুলো থেকে পাস করার পর দেশে ও বিদেশে চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু নির্দেশ দিলেই তারা ক্লাসে ফিরে আসবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ জন্য শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসার জন্য উৎসাহ বা প্রণোদনা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর

উপাচার্য আরও বলেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বোর্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে। যেমন তারা বলে “গাজীপুর বোর্ডে যাচ্ছি।” অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে কেবল বোর্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমরা এই ধারণা পরিবর্তন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে চাই এবং এই কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ইংরেজি ও আইসিটি বাধ্যতামূলক

উপাচার্য বলেন, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে অনেক কলেজে শিক্ষক ও ল্যাবের অভাব রয়েছে। আমরা এসব কলেজ চিহ্নিত করার কাজ করছি। প্রয়োজনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতে কম্পিউটার সরবরাহ করবে, যেখানে ন্যূনতম ল্যাব সুবিধাও নেই। কলেজ মনিটরিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে এবং অডিট চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৩০০টি জাতীয় পরীক্ষাকেন্দ্র (ন্যাশনাল এক্সাম সেন্টার) স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কার্যকর, আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

আলোচনা সভায় বক্তব্য

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র সমন্বয় দপ্তরের পরিচালক মো. আমিনুল আক্তার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আনন্দমোহন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শাকির হোসেন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকোনুজ্জামান রোকন, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী প্রমুখ।