সরকারি চাকরির বাংলা প্রশ্নে পরিবর্তন জরুরি: অধ্যাপক তারিক মনজুর
সরকারি চাকরির বাংলা প্রশ্নে পরিবর্তন জরুরি

সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ের প্রশ্ন প্রায় সব ক্ষেত্রেই আবশ্যিকভাবে থাকে। এসব প্রশ্ন সাধারণভাবে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ধারা অনুসরণ করে চলে। বাংলা একটি ভাষা, আর এই বিষয়ের প্রশ্নের মাধ্যমে প্রার্থীর ভাষাদক্ষতা যে যাচাই করা দরকার, সেটি সেসব প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ঠিকমতো প্রতিফলিত হয় না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর।

রচনা প্রশ্নের সমস্যা

লিখিত পরীক্ষায় একটি রচনা লিখতে দেওয়া হয়, যার বিষয় থাকে গতানুগতিক। রচনা পড়ে পরীক্ষক কিসের ভিত্তিতে নম্বর দেবেন, সেই নির্দেশনাও তাঁরা পান না। রচনার অন্তর্গত তথ্য বা পয়েন্ট হিসেবে কী কী লিখতে হবে, সেগুলো প্রশ্নে উল্লেখ থাকে না। ফলে ধারণা করা যায়, প্রার্থী আগে থেকেই কোনো রচনা মুখস্থ করে এসে পরীক্ষার খাতায় লিখে দেন। আবার সব খাতা যেহেতু একজন পরীক্ষক মূল্যায়ন করেন না, সেহেতু পরীক্ষকভেদে প্রদত্ত নম্বরের পার্থক্য ঘটে। তাই রচনা যদি লিখতে দিতেই হয়, তবে রচনার অন্তর্গত বিষয় বা পয়েন্টও প্রশ্নে উল্লেখ থাকা দরকার। কোন পয়েন্টে কত নম্বর বরাদ্দ, সেটিও ভাগ করে প্রশ্নে দেখানো উচিত। মোট নম্বরের শতকরা ২০ ভাগ থাকবে ভাষাদক্ষতার জন্য।

ভাবসম্প্রসারণের অকার্যকারিতা

লিখিত পরীক্ষায় ভাবসম্প্রসারণের বিষয়ে সাধারণত নতুন কিছু দেখা যায় না, স্কুল-কলেজে পড়া বা মুখস্থ করা বিষয়ই বেশির ভাগ সময় প্রশ্নে থাকে। যদি অভিনব কিছু লিখতেও দেওয়া হয়, তবু এই প্রশ্নের কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণ করা কঠিন। একজন ব্যক্তি চাকরিজীবনে নিশ্চয় এ ধরনের ভাবসম্প্রসারণ লেখেন না; বরং তাঁকে বিভিন্ন তথ্য এক করে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন বা এ–জাতীয় লেখা তৈরি করতে হয়। বাস্তব জীবনে বিবরণমূলক, তথ্যমূলক বা বিশ্লেষণমূলক লেখাও তৈরি করতে হয়। সুতরাং ভাবসম্প্রসারণের বদলে প্রশ্নে কিছু তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে তার ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রতিবেদন কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের লেখা তৈরি করতে দেওয়া যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সারাংশ ও সারমর্মের পুনরাবৃত্তি

চাকরির বাংলা প্রশ্নে যেসব সারাংশ বা সারমর্ম থাকে, সেগুলোও বছরের পর বছর বিভিন্ন পরীক্ষায় ঘুরেফিরে আসছে। এ রকম প্রশ্নের মাধ্যমে প্রার্থীর বোধগম্যতা, ভাষাদক্ষতা কিংবা ভাব-সংকোচন করার দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব নয়। সত্যিকার অর্থে যদি প্রার্থীর এসব সক্ষমতা যাচাই করতে হয়, তবে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের নমুনা উপকরণ কিংবা সমধর্মী লেখা প্রশ্নপত্রে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মোট নম্বর একসঙ্গে ১০ বা ২০ না রেখে এভাবে বণ্টন করা যায়: বোধগম্যতা ৫, ভাষাদক্ষতা ৫, ভাব-সংকোচন দক্ষতা ৫।

বঙ্গানুবাদে যান্ত্রিক অনুবাদের ব্যবহার

লিখিত পরীক্ষায় থাকা বঙ্গানুবাদেও সমস্যা আছে। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন কাঠামো ও গঠনের বাক্য প্রশ্নে রাখা দরকার। প্রশ্নের ইংরেজি অংশে এমন কিছু শব্দের প্রয়োগ থাকবে, যেগুলোর আক্ষরিক অনুবাদ করলে অর্থ হবে না। আজকাল বাস্তব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহায়তায় মানুষ অনুবাদ করে ফেলতে পারে; কিন্তু সেই অনুবাদে ত্রুটি রয়ে যায়। ফলে অনুবাদ-দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যাপারটিকে বর্তমানের উপযোগী করে তুলতে প্রশ্নের ধরনেও বদল আনা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে মূল ইংরেজি অংশের পাশাপাশি যান্ত্রিক অনুবাদও থাকবে। যান্ত্রিক অনুবাদটি প্রার্থী সংশোধন ও সম্পাদনা করে নতুন রূপ দেবেন।

ব্যাকরণ ও ভাষাদক্ষতা যাচাই

ব্যাকরণের প্রশ্নেও পরিবর্তন আনা দরকার। বিসিএস-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রায় ক্ষেত্রেই বাংলা শব্দগঠনের প্রক্রিয়া লিখতে দেওয়া হয়। মাতৃভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য এ ধরনের প্রশ্ন অকারণ। কারণ, ভাষা-ব্যবহারকারী শব্দ বানিয়ে বা গঠন করে বাক্যে ব্যবহার করেন না, অনায়াসেই শব্দ তাঁর মুখের বা লেখার ভাষায় আসে। আবার লিখিত পরীক্ষায় কিছু বাগ্‌ধারা বা প্রবাদ দেওয়া থাকে, সেগুলো অর্থসহ বাক্যে প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তারা খুঁজে খুঁজে এমন নমুনা দেন, যেগুলো সাধারণ ভাষা ব্যবহারে হয়তো প্রয়োগই হয় না। তা ছাড়া বাগ্‌ধারা বা প্রবাদ মূলত ব্যবহৃত হয় কথ্য বাগ্ভঙ্গিতে, প্রমিত লিখিত ভাষায় এর ব্যবহার কম। এমনকি বাক্য শুদ্ধ করার প্রশ্নে এমন সব বাক্য থাকে, যেগুলো কোনো না কোনো গাইড বইয়ে পাওয়া যায়। ব্যাকরণের এসব প্রশ্নের বদলে একটি অপরিমার্জিত অংশ সম্পাদনা করে নতুন করে লিখতে বলা যেতে পারে। প্রশ্নের সেই অংশটুকুও এমন হবে, যাতে প্রার্থীর ব্যাকরণগত ধারণা ও দক্ষতা বোঝা যায়।

পত্র ও যোগাযোগ দক্ষতা

লিখিত প্রশ্নে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর চিঠি, আবেদনপত্র, স্মারকলিপি ইত্যাদি লিখতে দেওয়া হয়। কিন্তু এভাবে প্রচলিত ধারায় পত্র লিখতে দিলে প্রার্থীর প্রকৃত যোগাযোগ-দক্ষতা যাচাই করা কঠিন। বরং একটি প্রসঙ্গ বা সমস্যা তুলে ধরে তার ওপর প্রশ্ন করা যায়। যেমন স্টোরকিপারের পদে আবেদনকারীর জন্য প্রসঙ্গ হতে পারে এমন: গুদামঘরের জানালা কেটে চোর জিনিসপত্র চুরি করেছে। এই পর্যায়ে কাজের ধাপ কী হবে এবং কার কার সঙ্গে কোন কোন ধরনের যোগাযোগ করতে হবে। প্রসঙ্গটি প্রশ্নে বিস্তৃতভাবে লেখা থাকবে, যাতে উত্তরকারী তাঁর লিখিত ও মৌখিক যোগাযোগের ধাপগুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় লেখার কাজ করতে পারেন। পুরো প্রশ্নপত্রটিই তৈরি করা দরকার বাস্তব প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে।

সাহিত্যজ্ঞান বনাম ভাষাদক্ষতা

লিখিত বাংলা প্রশ্নে সাহিত্যের প্রশ্নও দেখা যায়। কিন্তু প্রার্থীর সাহিত্যজ্ঞান যাচাই করা বাংলা প্রশ্নের উদ্দেশ্য হতে পারে না। বাংলায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সাহিত্য থেকেও প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ পদে আবেদনকারীর জন্য বাংলা প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য হবে তাঁর ভাষাদক্ষতা যাচাই করা।

যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা

প্রার্থীর যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতাও দেখা দরকার। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে প্রার্থীর পঠনপাঠন ও ভাষাদক্ষতা যাচাই করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে যেকোনো একটি বিষয়ের ওপর আলোচনা বা বক্তব্য থাকবে; এর বিপরীতে প্রার্থীকে ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করতে দিতে হবে। মতের বিপরীতে যুক্তি উপস্থাপন করার ব্যাপারটি মৌখিক পরীক্ষার সময়ও যাচাই করা যায়। মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর প্রমিত উচ্চারণের পারঙ্গমতাও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। মতামত লেখকের নিজস্ব।