দেশের একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন শিক্ষক পদোন্নতির মতো দাবিকে কেন্দ্র করে সর্বাত্মক অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তখন গোটা বিষয়টি গভীর উদ্বেগেরই বলতে হয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে একসঙ্গে ৭২ জন প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের পদত্যাগ এবং ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি প্রমাণ করে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের দূরত্ব কতখানি চরমে পৌঁছেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ ও পদোন্নতি সংকট
শিক্ষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের টালবাহানা আর সিন্ডিকেট সভায় খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের কারণে ৬০ জন শিক্ষকের পদোন্নতি ঝুলে আছে। গত ৩০ এপ্রিলের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে শিক্ষকেরা ক্লাসে ফিরেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা প্রশাসনের প্রধান কাজ হলেও আলোচ্য ক্ষেত্রে উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একগুঁয়েমি পরিস্থিতিকে জটিলতর করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
প্রশাসনিক কাঠামোর পতন
শিক্ষকেরা যখন প্রক্টর, ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে গণপদত্যাগ করেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে। বর্তমানে প্রশাসনিক ভবনের সব দপ্তরে তালা ঝুলছে, যা কোনোভাবেই একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাম্য নয়। অন্যদিকে উপাচার্য এই আন্দোলনকে ‘আইনবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, তা সংকট সমাধানের পথে ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষকেরা এখন উপাচার্যের অপসারণও দাবি করছেন, যা এই বিরোধকে একটি বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব
উপাচার্য ও শিক্ষকদের মধ্যকার এই দ্বৈরথের মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেশনজট আর অনিশ্চয়তা তাঁদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকদের কর্মবিরতি পালনের অধিকার থাকলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, এমন কর্মসূচিতে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার শিক্ষকেরা কেন কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হলেন, সেটি খতিয়ে দেখা প্রশাসনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল।
সমাধানের পথ
আমরা মনে করি, জেদাজেদি পরিহার করে উপাচার্য ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে আবার অর্থবহ ও কার্যকর আলোচনা শুরু করতে হবে। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার আলোকে পদোন্নতির বিষয়টি স্বচ্ছতার সঙ্গে সুরাহা করা প্রয়োজন। যেহেতু স্থানীয় প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারের উপস্থিতিতে হওয়া সমঝোতাও ব্যর্থ হয়েছে, তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচিত অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।
উপসংহার
বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার স্থান, ব্যক্তিগত জেদ বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে একে অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। আমরা আশা করি, অতি দ্রুত শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যকার ভুল–বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে।



