দেশে শিক্ষক সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি জটিলতা। মামলা থাকার কারণে প্রায় ৮৭ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ-পদোন্নতি আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
কর্মশালার উদ্বোধন
রোববার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ সরকার, গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই), ইউনিসেফ ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ-২০২৬’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, হাইকোর্টে বিচারাধীন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে থাকা হাজারো অমীমাংসিত মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
আলোচনার বিষয়বস্তু
অনুষ্ঠানে শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ, শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, শিক্ষার মান, শিক্ষা আইন ও ভবিষ্যতে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৮৩ হাজার মামলা
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। আমি জানি না কেন আমাদের বিচারব্যবস্থা আমাদের পক্ষে থাকছে না। বর্তমানে সাড়ে ৩২ হাজার শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির শিক্ষকদের বিষয়টি হাইকোর্টে বিচারাধীন। ফলে আমরা তাঁদের নিয়োগ দিতে পারছি না। তিন বছরের বেশি সময় আটকে আছে।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৮৩ হাজার অমীমাংসিত মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এসব মামলার সব কটি বিচারাধীন এবং আমরা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।’
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ১৪ হাজার ৩০০ জন প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু আমি জানি না কেন তারা রাতারাতি এত দ্রুত এই নিয়োগ সম্পন্ন করল। এতে শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাই আমরা এটি পর্যালোচনা করছি।’ প্রাথমিক শিক্ষা খাতে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষকের সংকট রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও ভর্তির হার
দেশে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার এখনো উদ্বেগজনক উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভর্তির হারও প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। ভর্তির হারও ততটা ভালো নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলড্রেসের ব্যবস্থা করছি।’
স্কুলের বাইরে ১০ লাখ শিশু
আলোচনায় শিক্ষা খাতে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জিপিই বোর্ডের সদস্য ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি বিস্তৃত শিক্ষা আইনের আওতায় আনতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘এর অন্যতম কারণ শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের আস্থার সংকট। অনেক শিক্ষার্থী বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসামুখী হচ্ছে। তাই শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে অভিভাবকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তিতে আগ্রহী হন।’
ইউনিসেফের উদ্বেগ
ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রধান দীপা শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশে এখনো প্রাথমিক পড়ার বয়সী প্রায় ১০ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। মাধ্যমিকে এই সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। এসব শিশু মূলত প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু ও দুর্গম এলাকার। তাদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, শিক্ষা খাতের এ বিশ্লেষণ শুধু নতুন তথ্য দেয়নি, বরং বিদ্যমান তথ্যগুলো একত্র করে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘এটি আমাদের দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে কোন খাতে জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জগুলোর প্রকৃত ব্যয় কত বড়।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডসন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশনের হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন মিখাল ক্রেইজা।



