বাংলাদেশ সরকার নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২৪ ঘোষণা করেছে, যা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আজ রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
নতুন শিক্ষানীতির মূল বৈশিষ্ট্য
নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণিতে বিভাগ পদ্ধতি বিলুপ্ত করা হবে। এর পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা তাদের আগ্রহ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবে। এছাড়া, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে তিনটি গ্রুপের পরিবর্তে মাত্র দুটি গ্রুপ থাকবে: মানবিক ও বিজ্ঞান। ব্যবসায় শিক্ষা গ্রুপটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাই শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বিষয় পড়ুক, যাতে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।' তিনি আরও জানান, নতুন কারিকুলামে ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর জোর দেওয়া হবে এবং তাত্ত্বিক পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক মূল্যায়নও গুরুত্ব পাবে।
উচ্চশিক্ষায় পরিবর্তন
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। স্নাতক পর্যায়ে চার বছর মেয়াদি কোর্স চালু থাকবে, তবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এক বছর মেয়াদি কোর্স চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে স্নাতকোত্তর কোর্স সাধারণত দেড় থেকে দুই বছর মেয়াদি হয়।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, 'আমরা চাই শিক্ষার্থীরা দ্রুত কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারে। তাই স্নাতকোত্তর কোর্সের মেয়াদ কমানো হচ্ছে।' নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রেডিট ট্রান্সফার সুবিধাও চালু হবে, যা শিক্ষার্থীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হতে সহায়তা করবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সংস্কার
প্রাথমিক শিক্ষায় পঞ্চম শ্রেণির পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি) বাতিল করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হবে। এছাড়া, মাধ্যমিক পর্যায়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। পরীক্ষার সংখ্যা কমানো হবে এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফলের ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাই শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করুক। তাই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।' তিনি আরও জানান, নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হবে।
বাস্তবায়ন সময়সীমা
নতুন শিক্ষানীতি আগামী ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পরিবর্তন আনা হবে। উচ্চশিক্ষার পরিবর্তনগুলো ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হবে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, 'নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আমাদের একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত আছে। আমরা আশা করি, এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।'
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণার পর বিভিন্ন মহল থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা একে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'নতুন শিক্ষানীতির লক্ষ্য ভালো, তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক।'
অন্যদিকে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সঠিকভাবে হবে কিনা। তবে শিক্ষামন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, 'নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে, যা তাদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করবে।'



