শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জোরালো দাবি উঠলো
দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাখাতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেশন সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, শিক্ষা হলো অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা এবং শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি অসম্ভব। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এসোসিয়েশন ফর ম্যাস এডভান্সমেন্ট নেটওয়ার্ক-আমান’ আয়োজিত এক ছাত্রবৃত্তি চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষায় সফলতার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা
কাদের গনি চৌধুরী শিক্ষায় সফলতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, যার যার জায়গা থেকে নিজের দায়িত্বটুকু সম্পর্কে যত্নবান হতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করলে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য অর্জন সম্ভব। তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকা স্পষ্ট করেন:
- শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব হলো নিয়মিত পড়ালেখা করা, পাঠে মনোযোগী হওয়া এবং হোমওয়ার্ক নিয়মিত করা।
- শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো নিয়মিত পাঠদান করা এবং সততার শিক্ষা দেওয়া।
- পরিবারের দায়িত্ব হলো সন্তানকে শিক্ষালয়ে পাঠানো, হোমওয়ার্ক করছে কি না দেখা এবং সন্তান কার সাথে মিশছে তা নজর রাখা।
অভিভাবকদের ভূমিকা ও সতর্কতা
অভিভাবকদের দায়িত্ব বেশি হলেও অনেকেই সন্তানকে স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেন, যা ঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। কাদের গনি চৌধুরী বলেন, একটি শিশু যখন হাত-পা নাড়তে শেখে, তখন থেকেই সে পরিবারের কাছ থেকে শিখতে শুরু করে। তাই বাড়ন্ত শিশুকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভালো-মন্দ বিষয়ে অবহিত করতে হয়। শিশুদের মন-মানসিকতা খুবই কোমল, তাই সহজেই যেকোনো বিষয় তারা শিখে নিতে পারে। বড়দের কর্তব্য হলো সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা, তাহলে সে সবকিছুই বাবা-মার সঙ্গে শেয়ার করবে।
তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার জায়গাটিও তুলে ধরেন: ঘরের পরিবেশ ভালো বলেই যে সন্তান সভ্য-ভদ্র ও আদর্শবান হবে—এমন ভেবে নিশ্চিন্ত বসে থাকা ঠিক নয়। তাই সন্তান বাইরে কাদের সঙ্গে মেশে, বন্ধুত্ব করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
শিক্ষাখাতে সরকারের বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা
শিক্ষা খাতের প্রতি সরকারের উদাসীনতার সমালোচনা করে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, শিক্ষা খাতে জাতীয় বজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু বাজেটের ১২ শতাংশের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না শিক্ষা খাতের বরাদ্দ। অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দিক থেকেও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।
তিনি বলেন, জিডিপির হিসাবে এ অঞ্চলের দেশ ভুটান, নেপাল, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ কম। ইউনেস্কোর চাওয়া ছিল জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ এবং জিডিপির হিসাবে ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া। কিন্তু এর ধারেকাছেও যাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
আমান’র নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ আবু ইউসুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কারিগরি ও শিক্ষা বিভাগের সচিব দাউদ মিয়া, ইকো ইউএস’র প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জামান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, মানারাত ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান প্রমুখ।
দাউদ মিয়া বলেন, প্রশিক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছাড়া যেমন শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনি মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা তথা টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শিক্ষা হলো শিশুর উর্বর মস্তিষ্কে বীজ বপনের মতো। প্রক্রিয়াগতভাবে এখানে যা-ই বপন করা হবে, তাই ফলবে। মানসম্মত শিক্ষার ধারণায় শিশুরা সিলেবাস শেষ করল কি না সেটি মুখ্য বিষয় নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখল সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের শিক্ষার মান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে উল্লেখ করে শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে যেসব তথ্য উঠে আসছে তা খুবই উদ্বেগজনক। কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের তথ্যে জানা গেল, বাংলাদেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমান। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশের স্নাতক সনদ ফাউন্ডেশন কোর্সের সমান।
তিনি বলেন, পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে বটে, কিন্তু মান বাড়েনি। শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। সরকারের সঠিক উদ্যোগ ছাড়া এ থেকে মুক্তির উপায় নেই। সরকার যেন সঠিক কর্মপদ্ধতি হাতে নেয় তার জন্য আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।



