সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালার আওতায় আনবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দেশে পরিচালিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারবে না। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে এবং তাদেরকে একটি রেগুলেটরি বোর্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিলেটে মতবিনিময় সভায় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস অডিটরিয়ামে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা উপলক্ষে সিলেট শিক্ষা বোর্ড এবং সিলেট অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সাথে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন বিএনসিসি, গার্লস গাইড ও স্কাউট কার্যক্রম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা খাতে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি
মন্ত্রী জানান, সরকার শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২২টি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ড্রেস প্রদান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদারসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি নকলের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে নকলের ধরন পরিবর্তিত হয়ে ডিজিটাল হয়েছে। তাই শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, নকলের মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার মান, কারিকুলাম, শিক্ষকতার গুণগত মান—সবকিছু উন্নত না হলে নকল বন্ধ করা সম্ভব নয়।
শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা
শিক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য এনটিআরসিএর মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল, মেডিকেল এলাউন্স ও হাউস রেন্ট বৃদ্ধির বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফলে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, যা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। একই শিক্ষক ও একই ব্যবস্থায় কখনো পাশের হার অনেক বেশি, আবার কখনো হঠাৎ কমে যাচ্ছে—এটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও অনিয়ম বন্ধ
মন্ত্রী আরও বলেন, খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে খাতা মূল্যায়নের অনিয়মের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরেন। যেমন:
- একাধিকবার রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া
- কোচিং নির্ভরতা
- অতিরিক্ত ফি আদায়
এসব অনিয়ম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
প্রযুক্তির মাধ্যমে তদারকি ও অনলাইন শিক্ষা
শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) স্থাপন করা হচ্ছে শুধু শিক্ষার্থীদের নজরদারির জন্য নয়, বরং শিক্ষা কার্যক্রমের মান পর্যবেক্ষণের জন্য। তিনি বলেন, আমার পক্ষে বা কয়েকজন কর্মকর্তার পক্ষে সব স্কুলে গিয়ে তদারকি করা সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা মন্ত্রণালয় থেকেই ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ করতে চাই।
অনলাইন শিক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়েছে। অনলাইন শিক্ষা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও আমাদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে। একদিন স্কুলে, একদিন বাসায়—এভাবে সমন্বিত পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কঠোর অবস্থান
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে সরকার অবকাঠামোর চেয়ে কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং যুগোপযোগী কারিকুলাম উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেবে। পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, খাতা মূল্যায়নে সঠিকতা নিশ্চিত করতে র্যান্ডম স্যাম্পলিং করা হবে। কেউ বেশি কঠিন, কেউ বেশি নমনীয়—এটি চলতে পারে না। একটি নিরপেক্ষ ও একরূপ মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়ন একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। শিক্ষক, প্রশাসন, অভিভাবক—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে।



