মিথ্যা মামলার আতঙ্কে লুকিয়ে পরীক্ষা দিয়েও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলেন মেধাবী ছাত্রী
পটুয়াখালীর গলাচিপায় এক নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রীর জীবন একটি মিথ্যা মামলার কারণে থমকে গেছে। তবুও তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে নিজের মেধার প্রমাণ দিয়েছেন। হাসিবুন নাহার সিনহার স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার, কিন্তু এখন তার পথ ভরে গেছে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায়।
আদালতের বারান্দা আর লুকিয়ে থাকা জীবন
হাসিবুন নাহার সিনহার দিন কাটছে আদালতের বারান্দা আর লুকিয়ে থাকার মধ্য দিয়ে। শনিবার রাতে গলাচিপা মহিলা কলেজ সড়কের নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানান। পড়াশোনা নির্বিঘ্ন রাখতে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীলদের কাছে ন্যায়বিচারও কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা গলাচিপা মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লুৎফুর নাহার, বড় ভাই শিহাব ও ছোট ভাই সাহাদাৎ। হাসিবুন লিখিত বক্তব্যে জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছেন। কিন্তু একটি অপ্রত্যাশিত মামলার কারণে তার জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।
পরীক্ষার সময়ই নেমে আসে দুর্ভাগ্য
হাসিবুনের ভাষায়, ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার সময়ই তার জীবনে এ দুর্ভাগ্য নেমে আসে। ২৯ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যখন তিনি হলে বসে ইংরেজি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, ঠিক সে সময়ের একটি ঘটনায় তাকে একটি মামলার ১২ নম্বর আসামি করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় তার দুঃসহ দিনযাপন।
গ্রেফতারের ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকতে পারেননি তিনি। আতঙ্কের মধ্যেই লুকিয়ে লুকিয়ে দিতে হয়েছে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো। এতে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ভেঙে পড়ে, তবুও থেমে থাকেনি তার চেষ্টা। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে গলাচিপা উপজেলা থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে তিনি নিজের মেধা ও অদম্য মনোবলের প্রমাণ দিয়েছেন।
হাসিবুন বলেন, ‘আমাকে যদি এ মামলায় জড়ানো না হতো, তাহলে আমি আরও ভালো ফল করতে পারতাম, মেধা তালিকায় স্থান পেতাম।’
জমি দখলের উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে তার বাবা হারুন অর রশিদ অভিযোগ করেন, পৈতৃক জমি দখলের উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। তিনি জানান, ১৯৮১ সালে তার বাবা আপ্তার আলী হাওলাদার গলাচিপা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের রতনদী মৌজায় প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ২০২৩ সালের জরিপে ওই জমির ৪৫ শতাংশ তার ও তার দুই ভাইয়ের নামে রেকর্ড হয় এবং বর্তমানে সেখানে তাদের বসতবাড়ি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর গলাচিপা থানায় সাধারণ ডায়রি করা হয়। এর জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিপক্ষ কাইয়ুম মৃধা ২৯ ডিসেম্বর রাতে তাদের জমি দখলের চেষ্টা চালায় এবং একই দিন পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি লুটের মামলা করে, যেখানে তার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকেও আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে কাইয়ুম মৃধার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। গলাচিপা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ঝিলন সিকদার বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি রেকর্ড করে তদন্ত করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় যারা জড়িত নন, তারা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হবেন না।
শিক্ষার্থীর সংগ্রাম ও আশার আলো
হাসিবুনের এই ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জের একটি উদাহরণ। মিথ্যা মামলার মতো বাধা সত্ত্বেও তার সাফল্য অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তবে তার পরিবার ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা চাইছে, যাতে হাসিবুন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য অবদান রাখতে পারেন।
এই ঘটনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আশা করা যায়, দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং হাসিবুনের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভয়মুক্ত পরিবেশে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবে।



