প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকশূন্যতা: ৫২% স্কুলে নেতৃত্ব নেই
৫২% প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই

দেশের অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬৫ হাজার ৪৫৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টিতে (প্রায় ৫২ শতাংশ) বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। এই সংকটের মূল কারণ ২০১৩ সালে ২২ হাজার ৯২৫টি রেজিস্টার্ড বেসরকারি বিদ্যালয়কে সরকারিকরণের পর প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ মামলা করায় আদালত স্থগিতাদেশ দেয়, যা এখনো বহাল রয়েছে।

১৩ বছরের দীর্ঘস্থায়ী সংকট

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সরকারিকরণের পর থেকেই এই সংকট শুরু হয়। প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতি প্রক্রিয়া মামলার কারণে আটকে আছে। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় দেরি এবং পদোন্নতিতে ধীরগতি এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে ২০ শতাংশ সরাসরি পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগের বিধান থাকলেও প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষকের নিয়োগপ্রক্রিয়া মামলা–সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে গেছে।

প্রধান শিক্ষকের শূন্যতার প্রভাব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে পড়ছে, বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং একজন প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বনিয়াদি শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বশূন্য থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পড়ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষক সংগঠনের বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব

শিক্ষক সংগঠনগুলোর বিভক্তি ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রায় ২৩টি সংগঠন রয়েছে। একই পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের এতগুলো সংগঠন থাকাটা বিস্ময়ের। অভিযোগ আছে, অনেক সংগঠনের নেতৃত্ব শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ বিদ্যালয়ে ঠিকমতো উপস্থিতও থাকেন না। শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পরিবর্তে সংগঠনগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত থাকায় তার খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।

দেশে সরকারি–বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। বনিয়াদি এই স্তরে শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত কতটা শক্ত হচ্ছে, তার ওপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা নির্ভর করে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখনঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠছে। গণিত, ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক শূন্য থাকায় শিক্ষার মান নিঃসন্দেহে কমছে।

দ্রুত সমাধানের আহ্বান

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, দ্রুত তার অবসান হওয়া প্রয়োজন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শিক্ষক সংগঠনগুলোকে অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক সংগঠনগুলোর মনে রাখা প্রয়োজন যে শিক্ষার্থীরা তাদের গ্রুপিং, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের বলি হতে পারে না। সরকার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। ১৩ বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেদিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে পদোন্নতি দিতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।