সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে স্থবিরতা: ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষা
সহকারী শিক্ষক নিয়োগে স্থবিরতা: ১৪ হাজার প্রার্থীর অপেক্ষা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে স্থবিরতা: ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও দুই মাস ধরে যোগদানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে এখনও নিয়োগপত্র পাননি তারা। এ নিয়ে সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন ওই সুপারিশপ্রাপ্তরা, যাতে তাদের দ্রুত যোগদানের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন, তবুও বিলম্ব

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ২২ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার সনদ ও ডোপ টেস্ট রিপোর্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জমা দেন প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীরা। এরপর ১ মার্চের মধ্যে সব মূল সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরম ও কোটার সনদসহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে নথিপত্র যাচাইয়ের কাজও সম্পন্ন করেন তারা। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সব আনুষ্ঠানিকতা সময়মতো শেষ হলেও, রহস্যজনক কারণে চূড়ান্ত নিয়োগপত্র ইস্যু করা হচ্ছে না, যার ফলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে প্রার্থীদের যোগদানের অপেক্ষা।

প্রার্থীরা জানান, চূড়ান্ত ফলাফলের পর মেডিক্যাল চেকআপ এবং ডোপ টেস্টসহ সব আনুষ্ঠানিকতা তারা নির্ধারিত সময়েই সম্পন্ন করেছেন। তবুও যোগদানের কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তারা আরও উল্লেখ করেন, চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও যোগদান না হওয়ায় এখন চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। গোপনে ভেরিফিকেশন চালানোসহ বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানোয় আতঙ্কিত তারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রার্থীদের আর্থিক ও মানসিক সংকট

স্মারকলিপিতে প্রার্থীরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ বিলম্বের কারণে বহু প্রার্থী আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন। কেউ কেউ আগের চাকরি থেকে পদত্যাগ করে বর্তমানে বেকার অবস্থায় রয়েছেন। আবার অনেক প্রার্থীর বয়সসীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প কোনও সরকারি চাকরির সুযোগও নেই। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের যোগদান প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া উদ্বেগজনক। এতে শুধু প্রার্থীরাই নয়, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্মারকলিপিতে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা বলেন, "আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও ফলপ্রসূ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক অত্যন্ত জরুরি। তাই আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত যোগদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।" বিষয়টি মানবিক ও জরুরি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে সহকারী শিক্ষক (২০২৫) ব্যাচের সব সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর দ্রুত যোগদান কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তারা।

প্রশাসনিক স্তরে ভয় ও রাজনৈতিক প্রভাব

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূল সমস্যাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকার পরিবর্তন। অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করে গেছে। এখন সরকারে আছে বিএনপি। তা ছাড়া কিছু অনিয়ম-জালিয়াতির বিষয় ঘটে। সবমিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে কোনও নড়চড় নেই।

এ বিষয়ে সরকার কিছু ভাবছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী কেউ এ নিয়ে কিছু বলছেন না। আবার ভয়ে বিষয়টি তাদের সামনে কোনও কর্মকর্তাও উপস্থাপন করতে সাহস করছেন না। যিনি এটা নিয়ে বেশি কথা বলবেন, তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে এমন ভীতি পেয়ে বসেছে। ফলে কর্মকর্তাদের কিছুই করার নেই। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যখন চাইবেন, তখন এটা হবে।

নিয়োগ পরীক্ষার পটভূমি

পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া দেশের ৬১ জেলায় গত ৯ জানুয়ারি একযোগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হয় মৌখিক পরীক্ষার জন্য। ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। তাতে জেলাভিত্তিক উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করে অধিদফতর।

বর্তমানে এই প্রার্থীরা আশা করছেন, দ্রুত তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তারা অবদান রাখতে পারবেন। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে, যা শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার মান হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।